১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনটি বিষয়ের ফলাফল এবং পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। প্রথমত, নতুনভাবে গঠিত ইসলামপন্থী জোটের নির্বাচনী ফলাফল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকা। এবং তৃতীয়ত, নির্বাচনী সহিংসতার ক্রমাগত ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ এক প্রতিবেদনে এ কথাই বলছে।
‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ বলছে, আওয়ামী লীগের মাঠের বাইরে থাকা এবং ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা বা পরিবর্তনের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ায় এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং দেশি-বিদেশি শক্তির কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
ইসলামী জোট
২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে নবগঠিত ইসলামী জোট। তবে জামায়াতের এই জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত সংসদীয় আসনে কতটা সাফল্য পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোটে বেশ কিছু ছোট ছোট ইসলামী দল যুক্ত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ইত্যাদি। অতীতের হিসেবে বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ নির্বাচনী ব্যবস্থায় জামায়াত বরাবরই ধুঁকেছে। দলটির সর্বোচ্চ নির্বাচনী সাফল্য এসেছিল ১৯৯১ সালে, যখন দলটি ১২.২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন জিতেছিল। পরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোতে তাদের ভোটের হার ৪-৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা আসন সংখ্যায় খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফলে জনসমর্থন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও তা সরাসরি আসন সংখ্যা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না।
এসব কিছুর সত্ত্বেও, এই নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর জন্য এ যাবৎকালের সেরা নির্বাচনী পারফরম্যান্সের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন সে কথাই বলছে। তারা বলছে, ছাত্র রাজনীতিতে তাদের জনপ্রিয়তা এখন ধারাবাহিকভাবে দৃশ্যমান। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রধান প্রধান ক্যাম্পাসগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় বিজয় তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতারই ইঙ্গিত দেয়। এই তরুণরা মূলত দলগুলোর পুরোনো ও নেতিবাচক রাজনীতির বিরোধী, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণরা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ এবং সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে তাদের হার আরও বেশি।
তবুও, এই ইসলামী জোটের মধ্যকার ঐক্য বেশ ভঙ্গুর। জুলাই আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গঠিত এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার পর ইতোমধ্যেই অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মুখে পড়েছে। বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নেত্রী আদর্শিক মতপার্থক্যের কারণে দল ত্যাগ করেছেন।
আরেক প্রভাবশালী ইসলামী দল পীর চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন বণ্টন ও আদর্শিক অবস্থানের অমিলের কারণে জোট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে এবং এখন স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে লড়ছে। জামায়াতের প্রচারণায় তাদের নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের একটি বিতর্কিত মন্তব্য, যেখানে তিনি একে ‘সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত’ সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া সংক্রান্ত ঘটনাটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিয়ে পুনরায় সংশয় সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের মতো এত গভীর প্রভাব আর কোনো দেশের নেই। আর এই বাস্তবতাই বর্তমান নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব, জাতীয়তাবাদী সংহতি এবং এলিটদের দরকষাকষি বোঝার জন্য দিল্লির ভূমিকাকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি এবং বাণিজ্যে সহযোগিতা গভীরতর হয়েছে। যদিও পানি বণ্টন, অভিবাসন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ রয়েই গেছে।
তবে অনেক বাংলাদেশি এই সময়কালকে একতরফা ছাড় দেওয়ার সময় হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব তুঙ্গে এবং ভারতে যৌথভাবে আয়োজিত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি উভয় পক্ষেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন বলছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশের বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের মতো রাজ্যগুলোতে বাঙালি অভিবাসীদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। জায়গাটিতে এমন একটি ন্যারেটিভ দাড় করানো হয়েছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ভোটারদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও হিন্দু সংখ্যালঘুদের রক্ষায় ইউনুস সরকারের কথিত ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করছে। তারা প্রায়শই হামলার ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করছে এবং অনেক বড় ঘটনাগুলোকে যেগুলোর মূলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে, সেগুলোকে স্পষ্ট সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে প্রচার করছে।
হাস্যকরভাবে, এই অভ্যন্তরীণ মনোভাবের মধ্যেই আবার কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন শুরুর কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং বিতর্কিত রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও, বিএনপি দিল্লির সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে সুসম্পর্ক করার চেষ্টা করেছে। যার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে, যেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর উপস্থিত হয়ে বিএনপি নেতৃত্বের কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা পৌঁছে দেন।
তবে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর কারণে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের পথ এখনো বাধাগ্রস্ত। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং ইতোমধ্যে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। ঢাকা থেকে বারবার তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীও তাদের সর্বশেষ ইশতেহারে অন্য কথা বলছে। দলটি ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ‘শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার’ অঙ্গীকার করেছে। যা থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনী বাস্তবতা হয়তো দীর্ঘদিনের অবস্থানগুলোকে পুনর্গঠন করছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষা হবে নির্বাচনের পর। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য রয়েছে যে, এই পাল্টাপাল্টি দ্বিপক্ষীয় অস্থিরতার অবসান হওয়া প্রয়োজন। তবে সীমান্তের উভয় পাশের পপুলিস্ট ন্যারেটিভ এবং অমীমাংসিত পানি বিরোধ, বিশেষ করে ২০২৬ সালের শেষে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং তিস্তা ইস্যুতে চীনের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রবেশকে সম্পর্ক উন্নয়নের পথকে সীমিত করে দিতে পারে।
নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে এবং নির্বাচন চলাকালীন সহিংসতার অন্যতম উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে আছে। ২০২৫ সালে লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক রাজনৈতিক হামলা ও দৈনন্দিন রাজপথের সহিংসতা উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ৯০০ টিরও বেশি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যার ফলে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৭ হাজার পাঁচ শর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন।
এসব মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা এবং প্রেশার গ্রুপ ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণার সময় গুলিবিদ্ধ হন। ভারতের সমালোচক হাদির গ্রুপ, এর আগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য লবিং করেছিল এবং অনেকেরই বিশ্বাস যে, আওয়ামী লীগ সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হাদির মৃত্যু ঢাকায় সহিংস বিক্ষোভের সূত্রপাত করে। যার মধ্যে ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, এই পত্রিকা দুটি ভারতপন্থী সম্পাদকীয় অবস্থান বজায় রাখছে।
তৃণমূল পর্যায়ে, দল মনোনীত প্রার্থী এবং তথাকথিত ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ সহিংসতার একটি প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা বিশেষ করে বিএনপির ক্ষেত্রে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। যা দলের দুর্বল শৃঙ্খলা এবং আন্তঃদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রতিফলন।
তবে বাংলাদেশে নির্বাচনী সহিংসতা মোটেও নতুন কিছু নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে প্রায়ই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ দেখা গেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং ভোটের দিনে এ ঘটনা বেশি ঘটে। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। যদিও এই সংখ্যাগুলোতে ভিন্নতা রয়েছে। বিপরীতে, ২০০৮ সালের নির্বাচন, যা একটি সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম সহিংস জাতীয় নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ডিপ্লোম্যাট বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি খুব একটা আশানুরূপ নয়। রাজনৈতিক ও মব ভায়োলেন্স ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। যেখানে জনতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের কারণে পুলিশ বাহিনী জনরোষের মুখে পড়ে এখনও ধুঁকছে, যা তাদের রাজনৈতিকভাবে সংকুচিত এবং পারিচালনগতভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। এই সমস্যার সাথে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় পরিত্যক্ত থানাগুলো থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র। যার অনেকগুলোই এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও সংযম বজায় রাখতে হিমশিম খাওয়ায় নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ততই অস্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সম্ভাব্য প্রাণঘাতী সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছবি: বাসস
১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনটি বিষয়ের ফলাফল এবং পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। প্রথমত, নতুনভাবে গঠিত ইসলামপন্থী জোটের নির্বাচনী ফলাফল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকা। এবং তৃতীয়ত, নির্বাচনী সহিংসতার ক্রমাগত ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ এক প্রতিবেদনে এ কথাই বলছে।
‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ বলছে, আওয়ামী লীগের মাঠের বাইরে থাকা এবং ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা বা পরিবর্তনের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ায় এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং দেশি-বিদেশি শক্তির কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
ইসলামী জোট
২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে নবগঠিত ইসলামী জোট। তবে জামায়াতের এই জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত সংসদীয় আসনে কতটা সাফল্য পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোটে বেশ কিছু ছোট ছোট ইসলামী দল যুক্ত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ইত্যাদি। অতীতের হিসেবে বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ নির্বাচনী ব্যবস্থায় জামায়াত বরাবরই ধুঁকেছে। দলটির সর্বোচ্চ নির্বাচনী সাফল্য এসেছিল ১৯৯১ সালে, যখন দলটি ১২.২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন জিতেছিল। পরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোতে তাদের ভোটের হার ৪-৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা আসন সংখ্যায় খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফলে জনসমর্থন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও তা সরাসরি আসন সংখ্যা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না।
এসব কিছুর সত্ত্বেও, এই নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর জন্য এ যাবৎকালের সেরা নির্বাচনী পারফরম্যান্সের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন সে কথাই বলছে। তারা বলছে, ছাত্র রাজনীতিতে তাদের জনপ্রিয়তা এখন ধারাবাহিকভাবে দৃশ্যমান। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রধান প্রধান ক্যাম্পাসগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় বিজয় তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতারই ইঙ্গিত দেয়। এই তরুণরা মূলত দলগুলোর পুরোনো ও নেতিবাচক রাজনীতির বিরোধী, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণরা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ এবং সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে তাদের হার আরও বেশি।
তবুও, এই ইসলামী জোটের মধ্যকার ঐক্য বেশ ভঙ্গুর। জুলাই আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গঠিত এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার পর ইতোমধ্যেই অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মুখে পড়েছে। বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নেত্রী আদর্শিক মতপার্থক্যের কারণে দল ত্যাগ করেছেন।
আরেক প্রভাবশালী ইসলামী দল পীর চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন বণ্টন ও আদর্শিক অবস্থানের অমিলের কারণে জোট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে এবং এখন স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে লড়ছে। জামায়াতের প্রচারণায় তাদের নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের একটি বিতর্কিত মন্তব্য, যেখানে তিনি একে ‘সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত’ সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া সংক্রান্ত ঘটনাটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিয়ে পুনরায় সংশয় সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের মতো এত গভীর প্রভাব আর কোনো দেশের নেই। আর এই বাস্তবতাই বর্তমান নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব, জাতীয়তাবাদী সংহতি এবং এলিটদের দরকষাকষি বোঝার জন্য দিল্লির ভূমিকাকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি এবং বাণিজ্যে সহযোগিতা গভীরতর হয়েছে। যদিও পানি বণ্টন, অভিবাসন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ রয়েই গেছে।
তবে অনেক বাংলাদেশি এই সময়কালকে একতরফা ছাড় দেওয়ার সময় হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব তুঙ্গে এবং ভারতে যৌথভাবে আয়োজিত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি উভয় পক্ষেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন বলছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশের বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের মতো রাজ্যগুলোতে বাঙালি অভিবাসীদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। জায়গাটিতে এমন একটি ন্যারেটিভ দাড় করানো হয়েছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ভোটারদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও হিন্দু সংখ্যালঘুদের রক্ষায় ইউনুস সরকারের কথিত ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করছে। তারা প্রায়শই হামলার ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করছে এবং অনেক বড় ঘটনাগুলোকে যেগুলোর মূলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে, সেগুলোকে স্পষ্ট সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে প্রচার করছে।
হাস্যকরভাবে, এই অভ্যন্তরীণ মনোভাবের মধ্যেই আবার কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন শুরুর কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং বিতর্কিত রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও, বিএনপি দিল্লির সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে সুসম্পর্ক করার চেষ্টা করেছে। যার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে, যেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর উপস্থিত হয়ে বিএনপি নেতৃত্বের কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা পৌঁছে দেন।
তবে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর কারণে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের পথ এখনো বাধাগ্রস্ত। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং ইতোমধ্যে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। ঢাকা থেকে বারবার তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীও তাদের সর্বশেষ ইশতেহারে অন্য কথা বলছে। দলটি ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ‘শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার’ অঙ্গীকার করেছে। যা থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনী বাস্তবতা হয়তো দীর্ঘদিনের অবস্থানগুলোকে পুনর্গঠন করছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষা হবে নির্বাচনের পর। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য রয়েছে যে, এই পাল্টাপাল্টি দ্বিপক্ষীয় অস্থিরতার অবসান হওয়া প্রয়োজন। তবে সীমান্তের উভয় পাশের পপুলিস্ট ন্যারেটিভ এবং অমীমাংসিত পানি বিরোধ, বিশেষ করে ২০২৬ সালের শেষে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং তিস্তা ইস্যুতে চীনের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রবেশকে সম্পর্ক উন্নয়নের পথকে সীমিত করে দিতে পারে।
নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে এবং নির্বাচন চলাকালীন সহিংসতার অন্যতম উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে আছে। ২০২৫ সালে লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক রাজনৈতিক হামলা ও দৈনন্দিন রাজপথের সহিংসতা উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ৯০০ টিরও বেশি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যার ফলে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৭ হাজার পাঁচ শর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন।
এসব মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা এবং প্রেশার গ্রুপ ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণার সময় গুলিবিদ্ধ হন। ভারতের সমালোচক হাদির গ্রুপ, এর আগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য লবিং করেছিল এবং অনেকেরই বিশ্বাস যে, আওয়ামী লীগ সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হাদির মৃত্যু ঢাকায় সহিংস বিক্ষোভের সূত্রপাত করে। যার মধ্যে ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, এই পত্রিকা দুটি ভারতপন্থী সম্পাদকীয় অবস্থান বজায় রাখছে।
তৃণমূল পর্যায়ে, দল মনোনীত প্রার্থী এবং তথাকথিত ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ সহিংসতার একটি প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা বিশেষ করে বিএনপির ক্ষেত্রে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। যা দলের দুর্বল শৃঙ্খলা এবং আন্তঃদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রতিফলন।
তবে বাংলাদেশে নির্বাচনী সহিংসতা মোটেও নতুন কিছু নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে প্রায়ই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ দেখা গেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং ভোটের দিনে এ ঘটনা বেশি ঘটে। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। যদিও এই সংখ্যাগুলোতে ভিন্নতা রয়েছে। বিপরীতে, ২০০৮ সালের নির্বাচন, যা একটি সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়েছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম সহিংস জাতীয় নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ডিপ্লোম্যাট বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি খুব একটা আশানুরূপ নয়। রাজনৈতিক ও মব ভায়োলেন্স ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। যেখানে জনতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের কারণে পুলিশ বাহিনী জনরোষের মুখে পড়ে এখনও ধুঁকছে, যা তাদের রাজনৈতিকভাবে সংকুচিত এবং পারিচালনগতভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। এই সমস্যার সাথে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় পরিত্যক্ত থানাগুলো থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র। যার অনেকগুলোই এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও সংযম বজায় রাখতে হিমশিম খাওয়ায় নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ততই অস্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সম্ভাব্য প্রাণঘাতী সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।