ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ এপস্টিন সিন্ডিকেটের যুদ্ধ। এই সিন্ডিকেট যে উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়, তার মধ্যে একটি ছিল ইরানকে ধ্বংস করা। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে ধরে নিতে পারি যে এই যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় নিশ্চিত। আমেরিকার অস্ত্র ভাণ্ডার শূন্য হতে চলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে সে এখন আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আনতে ব্যস্ত। ইসরায়েল ইতিমধ্যে আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছে তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার দ্রুত নিঃশেষ হতে যাচ্ছে।
তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্র্যাম্প ন্যাটোর শক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন। সেটি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ন্যাটোর প্রধান শক্তি আমেরিকা। ফলে ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশ যোগ দিলেও হরমুজ অবরোধ ভাঙা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রশান্ত মহাসাগরের দেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া হরমুজ অভিযানে অংশ নেবে না বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে যুদ্ধ নিয়ে তীব্র সংশয় রয়েছে। সেই সাথে চলছে ট্র্যাম্পের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা।
ইরানের মিত্র দেশগুলো ইতিমধ্যে নানাভাবে ইরানের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার মধ্যে একটি উদাহরণ ইরানের ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ মুরতজা খোমেনির চিকিৎসা। তার আহত হওয়ার খবর আগেই পাওয়া গিয়েছিল। তিনি হাত ও পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে ইরানের কোনো হাসপাতালে তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে ভেবে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের দাবি।
ইসরায়েলের মুল লক্ষ্যবস্তু বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, যেমন হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ অবকাঠামো। সে কারণে বাইরের কোনো দেশে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত যথেষ্ট যৌক্তিক বলে মনে করি। এই তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে তিনি মস্কো গেছেন কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী রুশ শহর আস্ত্রাখান দিয়ে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি যুদ্ধ বিমান পাঠিয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার তার চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তিনি এখন সুস্থ আছেন।
গালফ দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরান তার হামলা তীব্র করেছে। দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ। কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আবরের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমন তীব্র হয়েছে। ইরান এখন ‘সেজিল’ নামে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গুণগতভাবে আরও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। গত রাতে তেল আবিব ও হাইফা বন্দর এই ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় আক্রান্ত হয়।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি যদি আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে যে ধরনের চরম সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে, তার মধ্যে সম্ভব্য দুটোর কথা ভাবতে পারি। একটি ফলস ফ্ল্যাগ আক্রমন চালিয়ে ইরানকে দোষারোপ করা। এই আক্রমনের সম্ভব্য দুটো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারিত হলেও হতে পারে। তার মধ্যে একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল আকসা মসজিদ। এই মসজিদে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল চেষ্টা করবে ইরানকে দোষারোপ করতে। তাতে করে শিয়া ও সুন্নি বিভেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে। ইসরায়েলের শাসক গোষ্ঠী সেই ধরনের আশা পোষণ করে। নানা খবরে প্রকাশ, ইসরায়েল আল আকসা মসজিদের আশপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়ির কাজ বেশ আগেই শুরু করেছিল। ফলে মসজিদটির ভিত ইতিমধ্যে নাজুক হলেও হতে পারে। তারপর সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বা বোমা ব্যবহার করে তার ক্ষতিসাধন করার ষড়যন্ত্র অকল্পনীয় নয়।
অন্য একটি লক্ষ্য বস্তু হতে পারে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের নগরী লস অ্যাঞ্জেলস অথবা ক্যালিফোর্নিয়া। সেখানে হাইরাইজ কোন বিল্ডিং তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এই ষড়যন্ত্র যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ট্র্যাম্পের পেছনে দেশের মানুষ সমবেত হবে এবং তাকে সমর্থন জানাবে। এর আগে ইসরায়েল তুরস্ক, আজারবাইজান ও সৌদি আরবে ফলস ফ্ল্যাগ আক্রমন চালিয়েছিল। সে সময় উত্তেজনা প্রশমন করার লক্ষে পাকিস্থান ভালো ভূমিকা পালন করে। ইরান যে এতে জড়িত ছিল না, পাকিস্থানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সৌদি আরবকে জানিয়ে দেয়। অবশ্য পারমাণবিক বোমা হামলার সম্ভবনাকেও নাকচ করা যায় না। বিশেষ করে ট্র্যাম্প বা নেতানিয়াহুর মতো উন্মত্ত ও যুদ্ধবাজদের হাতে যখন ওই দুই দেশের যুদ্ধনীতি জিম্মি।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ মরা-বাঁচার যুদ্ধ। কেন, তার পক্ষে তিনটি যুক্তি উল্লেখ করতে পারি। এক. ইসরাইলের একমাত্র শক্তিশালী শত্রু ইরান। আশপাশের বাকি সব শত্রুকে ইসরায়েল ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তার মধ্যে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, জর্ডান, মিশর ও লেবানন অন্তর্ভুক্ত। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলে ভৌগলিক অর্থে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আমাদের নির্বোধ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এই মারাত্মক ভূ-রাজনীতির খেলাটা বুঝলো না। তারা আব্রাহাম একরডে সই করে নিজেদেরকে বিক্রি করে দিল। তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ যে নেই, তা নয়। প্রথমত, তারা আজ এমন এক জীবনে অভ্যস্ত, যেটি ভোগবাদী ও সুখবাদে আক্রান্ত। তেল বিক্রি করে তারা প্রচুর অর্থ পায়। সেটি নিঃশেষহীন ভেবে সুখের সাগরে ভাসার এক কল্পনা বিলাসে তারা ডুবে আছে। আর সামরিক নিরাপত্তার জন্য রয়েছে ‘মহাশক্তিবান’ যুক্তরাষ্ট্র। তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে আমেরিকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র কেনে। কিন্তু সেটি তাদের কাছে প্রতিরক্ষা কবজ নয়। বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রকে তারা গহনা হিসেবে দেখে। যেটুকু সামরিক শক্তি তাদের আছে, সেটিও অকার্যকর। অথচ তার পেছনে তারা ব্যয় করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।
দ্বিতীয় কারণ, পেট্র ডলার। পেট্রল ছাড়া যানবাহন অচল। আর হাইড্রো কার্বন থেকে উৎপাদিত হয় প্ল্যাস্টিক, বিদ্যুৎ, নানা ধরনের রসায়নিক দ্রব্য, কৃষির জন্য সার, জুতা, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে আরও অনেক পণ্য। উপসাগরীয় দেশগুলো তেল উৎপাদন করে। সেখানকার তেল উৎপাদন এবং বিতরন মার্কিন ও অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন ডলার ছাড়া পেট্রল থেকে আয় করা অর্থ লেনদেন হয় না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন ডলারকে বৈশ্বিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। ডলারের গুরুত্ব বৃদ্ধির একটি কারণ ছিল ১৯৭৩ সালের ইসরায়েলি হামলা। ওই হামলার প্রতিবাদে ওপেক দেশগুলো তেল রপ্তানি কমিয়ে দেয় । ফলে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পশ্চিমা দেশগুলো দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
আমেরিকা এর একটি সমাধান বের করে। সেটি হচ্ছে সৌদি আরব কেবল মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করবে। আর আমেরিকা তার সামরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও সৌদি আরবের পথ অনুসরন করে। ফলে তেল আমদানি করা দেশগুলো মার্কিন ডলারে তেল কিনতে বাধ্য হয়। তাদের রিজার্ভকে গড়ে তুলতে হয় মার্কিন ডলারে। এতে করে মার্কিন ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। গালফ দেশের পেট্র ডলার মার্কিন ব্যাঙ্কে জমা হতে থাকে।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
এই ডলার তারা আমেরিকার নানা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে অথবা মার্কিন কোম্পানি ক্রয়ে ব্যয় করে। শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলার টিকে থাকার একমাত্র কারণ পেট্র ডলার। ইরান যুদ্ধ পেট্র ডলারকেন্দ্রিক সংকটকে ঘনিভুত করেছে। ফলে আমেরিকার জন্য এ যুদ্ধ বাঁচা-মরার যুদ্ধ।
তৃতীয়, এপস্টিন সিন্ডিকেটের অন্য লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সেটি সামরিক অভিযান চালিয়ে নয়। বরং ডাটা সেন্টারের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আর্থিক দিককে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। এই ডাটা সেন্টারগুলোর মালিকানা জায়নবাদী আদর্শের সাথে সম্পৃক্ত অথবা আমেরিকার খ্রিস্টান জায়নবাদী প্রতিষ্ঠান ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিস্টিয়ান গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর হাতে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ, তার মধ্যে প্রধান আমেরিকা, এই সব ডাটা সেন্টারের সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই তালিকায় রয়েছে প্যালান্টির, মাইক্রোসফট, আমাজোন ওয়েব সার্ভিস, ওপেন এআই, অ্যাপল নামের কোম্পানিগুলো।
এ সব কোম্পানির সিইওরা, যেমন স্যাম আল্টম্যান, পিটার থিয়েল, টিম কুক এবং আরও অনেকে এপস্টিন সিন্ডিকেটের সদস্য। এরা সম্মিলিতভাবে গালফ স্টেটগুলোর প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগের দায়িত্বে আছে। যে পরিমাণ পুঁজি তারা সেখানে নিয়ন্ত্রণ করে, তার পরিমাণ ৫২ ট্রিলিয়ন ডলার। কেবল পুঁজি নয়, এরা আরও নিয়ন্ত্রণ করছে গালফ দেশগুলোর নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র। এই কোম্পানিগুলো যেহেতু প্রত্যক্ষভাবে এপস্টিন সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত এবং ওই সিন্ডিকেটের মূল চালিকা শক্তি ইসরাইলের মোসাদ। সেজন্য গালফ দেশ এবং তাদের সম্পদের নিয়ন্ত্রণভার পরোক্ষভাবে থাকবে ইসরাইলের হাতে। জায়নবাদের সাথে সম্পৃক্ত এই কোম্পানির সহায়তায় ‘পাক্স জুডেইকা’ অর্থাৎ জায়নবাদের অধীনে দীর্ঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এপস্টিন সিন্ডিকেটের মুল উদ্দেশ্য। সেই ধরনের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আমরা ইতিহাসে ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছি।
১৮১৫ সাল থেকে ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’ নামে ব্রিটেন প্রতিষ্ঠিত শান্তির কথা জানি, যদিও ওই সময়কাল কতটুকু শান্তিপূর্ণ ছিল, জানি না। ১৯৪৫ সাল থেকে ‘প্যাক্স অ্যামেরিকানা’ নামে আমেরিকার অধীনে বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এবার সেই ধরনের একটি দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা ইসরায়েলের। ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ সে কারণে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে সীমিত ভাবা ভুল। এর প্রভাব ও উদ্দেশ্য সুদুরপ্রসারী। রক্তের বিনিময়ে ইরান এই চক্রান্ত ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সে দিক থেকে ভাবলে এ যুদ্ধ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে মুল্যায়িত হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ এপস্টিন সিন্ডিকেটের যুদ্ধ। এই সিন্ডিকেট যে উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়, তার মধ্যে একটি ছিল ইরানকে ধ্বংস করা। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে ধরে নিতে পারি যে এই যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় নিশ্চিত। আমেরিকার অস্ত্র ভাণ্ডার শূন্য হতে চলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে সে এখন আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আনতে ব্যস্ত। ইসরায়েল ইতিমধ্যে আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছে তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার দ্রুত নিঃশেষ হতে যাচ্ছে।
তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্র্যাম্প ন্যাটোর শক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন। সেটি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ন্যাটোর প্রধান শক্তি আমেরিকা। ফলে ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশ যোগ দিলেও হরমুজ অবরোধ ভাঙা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রশান্ত মহাসাগরের দেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া হরমুজ অভিযানে অংশ নেবে না বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে যুদ্ধ নিয়ে তীব্র সংশয় রয়েছে। সেই সাথে চলছে ট্র্যাম্পের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা।
ইরানের মিত্র দেশগুলো ইতিমধ্যে নানাভাবে ইরানের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার মধ্যে একটি উদাহরণ ইরানের ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ মুরতজা খোমেনির চিকিৎসা। তার আহত হওয়ার খবর আগেই পাওয়া গিয়েছিল। তিনি হাত ও পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে ইরানের কোনো হাসপাতালে তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে ভেবে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের দাবি।
ইসরায়েলের মুল লক্ষ্যবস্তু বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, যেমন হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ অবকাঠামো। সে কারণে বাইরের কোনো দেশে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত যথেষ্ট যৌক্তিক বলে মনে করি। এই তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে তিনি মস্কো গেছেন কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী রুশ শহর আস্ত্রাখান দিয়ে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি যুদ্ধ বিমান পাঠিয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার তার চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তিনি এখন সুস্থ আছেন।
গালফ দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরান তার হামলা তীব্র করেছে। দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ। কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আবরের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমন তীব্র হয়েছে। ইরান এখন ‘সেজিল’ নামে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গুণগতভাবে আরও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। গত রাতে তেল আবিব ও হাইফা বন্দর এই ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় আক্রান্ত হয়।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি যদি আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে যে ধরনের চরম সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে, তার মধ্যে সম্ভব্য দুটোর কথা ভাবতে পারি। একটি ফলস ফ্ল্যাগ আক্রমন চালিয়ে ইরানকে দোষারোপ করা। এই আক্রমনের সম্ভব্য দুটো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারিত হলেও হতে পারে। তার মধ্যে একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল আকসা মসজিদ। এই মসজিদে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল চেষ্টা করবে ইরানকে দোষারোপ করতে। তাতে করে শিয়া ও সুন্নি বিভেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে। ইসরায়েলের শাসক গোষ্ঠী সেই ধরনের আশা পোষণ করে। নানা খবরে প্রকাশ, ইসরায়েল আল আকসা মসজিদের আশপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়ির কাজ বেশ আগেই শুরু করেছিল। ফলে মসজিদটির ভিত ইতিমধ্যে নাজুক হলেও হতে পারে। তারপর সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বা বোমা ব্যবহার করে তার ক্ষতিসাধন করার ষড়যন্ত্র অকল্পনীয় নয়।
অন্য একটি লক্ষ্য বস্তু হতে পারে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের নগরী লস অ্যাঞ্জেলস অথবা ক্যালিফোর্নিয়া। সেখানে হাইরাইজ কোন বিল্ডিং তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এই ষড়যন্ত্র যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ট্র্যাম্পের পেছনে দেশের মানুষ সমবেত হবে এবং তাকে সমর্থন জানাবে। এর আগে ইসরায়েল তুরস্ক, আজারবাইজান ও সৌদি আরবে ফলস ফ্ল্যাগ আক্রমন চালিয়েছিল। সে সময় উত্তেজনা প্রশমন করার লক্ষে পাকিস্থান ভালো ভূমিকা পালন করে। ইরান যে এতে জড়িত ছিল না, পাকিস্থানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সৌদি আরবকে জানিয়ে দেয়। অবশ্য পারমাণবিক বোমা হামলার সম্ভবনাকেও নাকচ করা যায় না। বিশেষ করে ট্র্যাম্প বা নেতানিয়াহুর মতো উন্মত্ত ও যুদ্ধবাজদের হাতে যখন ওই দুই দেশের যুদ্ধনীতি জিম্মি।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ মরা-বাঁচার যুদ্ধ। কেন, তার পক্ষে তিনটি যুক্তি উল্লেখ করতে পারি। এক. ইসরাইলের একমাত্র শক্তিশালী শত্রু ইরান। আশপাশের বাকি সব শত্রুকে ইসরায়েল ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তার মধ্যে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, জর্ডান, মিশর ও লেবানন অন্তর্ভুক্ত। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলে ভৌগলিক অর্থে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আমাদের নির্বোধ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এই মারাত্মক ভূ-রাজনীতির খেলাটা বুঝলো না। তারা আব্রাহাম একরডে সই করে নিজেদেরকে বিক্রি করে দিল। তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ যে নেই, তা নয়। প্রথমত, তারা আজ এমন এক জীবনে অভ্যস্ত, যেটি ভোগবাদী ও সুখবাদে আক্রান্ত। তেল বিক্রি করে তারা প্রচুর অর্থ পায়। সেটি নিঃশেষহীন ভেবে সুখের সাগরে ভাসার এক কল্পনা বিলাসে তারা ডুবে আছে। আর সামরিক নিরাপত্তার জন্য রয়েছে ‘মহাশক্তিবান’ যুক্তরাষ্ট্র। তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে আমেরিকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র কেনে। কিন্তু সেটি তাদের কাছে প্রতিরক্ষা কবজ নয়। বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রকে তারা গহনা হিসেবে দেখে। যেটুকু সামরিক শক্তি তাদের আছে, সেটিও অকার্যকর। অথচ তার পেছনে তারা ব্যয় করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।
দ্বিতীয় কারণ, পেট্র ডলার। পেট্রল ছাড়া যানবাহন অচল। আর হাইড্রো কার্বন থেকে উৎপাদিত হয় প্ল্যাস্টিক, বিদ্যুৎ, নানা ধরনের রসায়নিক দ্রব্য, কৃষির জন্য সার, জুতা, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে আরও অনেক পণ্য। উপসাগরীয় দেশগুলো তেল উৎপাদন করে। সেখানকার তেল উৎপাদন এবং বিতরন মার্কিন ও অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন ডলার ছাড়া পেট্রল থেকে আয় করা অর্থ লেনদেন হয় না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন ডলারকে বৈশ্বিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। ডলারের গুরুত্ব বৃদ্ধির একটি কারণ ছিল ১৯৭৩ সালের ইসরায়েলি হামলা। ওই হামলার প্রতিবাদে ওপেক দেশগুলো তেল রপ্তানি কমিয়ে দেয় । ফলে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পশ্চিমা দেশগুলো দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
আমেরিকা এর একটি সমাধান বের করে। সেটি হচ্ছে সৌদি আরব কেবল মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করবে। আর আমেরিকা তার সামরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও সৌদি আরবের পথ অনুসরন করে। ফলে তেল আমদানি করা দেশগুলো মার্কিন ডলারে তেল কিনতে বাধ্য হয়। তাদের রিজার্ভকে গড়ে তুলতে হয় মার্কিন ডলারে। এতে করে মার্কিন ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। গালফ দেশের পেট্র ডলার মার্কিন ব্যাঙ্কে জমা হতে থাকে।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
এই ডলার তারা আমেরিকার নানা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে অথবা মার্কিন কোম্পানি ক্রয়ে ব্যয় করে। শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলার টিকে থাকার একমাত্র কারণ পেট্র ডলার। ইরান যুদ্ধ পেট্র ডলারকেন্দ্রিক সংকটকে ঘনিভুত করেছে। ফলে আমেরিকার জন্য এ যুদ্ধ বাঁচা-মরার যুদ্ধ।
তৃতীয়, এপস্টিন সিন্ডিকেটের অন্য লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সেটি সামরিক অভিযান চালিয়ে নয়। বরং ডাটা সেন্টারের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আর্থিক দিককে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। এই ডাটা সেন্টারগুলোর মালিকানা জায়নবাদী আদর্শের সাথে সম্পৃক্ত অথবা আমেরিকার খ্রিস্টান জায়নবাদী প্রতিষ্ঠান ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিস্টিয়ান গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর হাতে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ, তার মধ্যে প্রধান আমেরিকা, এই সব ডাটা সেন্টারের সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই তালিকায় রয়েছে প্যালান্টির, মাইক্রোসফট, আমাজোন ওয়েব সার্ভিস, ওপেন এআই, অ্যাপল নামের কোম্পানিগুলো।
এ সব কোম্পানির সিইওরা, যেমন স্যাম আল্টম্যান, পিটার থিয়েল, টিম কুক এবং আরও অনেকে এপস্টিন সিন্ডিকেটের সদস্য। এরা সম্মিলিতভাবে গালফ স্টেটগুলোর প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগের দায়িত্বে আছে। যে পরিমাণ পুঁজি তারা সেখানে নিয়ন্ত্রণ করে, তার পরিমাণ ৫২ ট্রিলিয়ন ডলার। কেবল পুঁজি নয়, এরা আরও নিয়ন্ত্রণ করছে গালফ দেশগুলোর নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র। এই কোম্পানিগুলো যেহেতু প্রত্যক্ষভাবে এপস্টিন সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত এবং ওই সিন্ডিকেটের মূল চালিকা শক্তি ইসরাইলের মোসাদ। সেজন্য গালফ দেশ এবং তাদের সম্পদের নিয়ন্ত্রণভার পরোক্ষভাবে থাকবে ইসরাইলের হাতে। জায়নবাদের সাথে সম্পৃক্ত এই কোম্পানির সহায়তায় ‘পাক্স জুডেইকা’ অর্থাৎ জায়নবাদের অধীনে দীর্ঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এপস্টিন সিন্ডিকেটের মুল উদ্দেশ্য। সেই ধরনের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আমরা ইতিহাসে ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছি।
১৮১৫ সাল থেকে ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’ নামে ব্রিটেন প্রতিষ্ঠিত শান্তির কথা জানি, যদিও ওই সময়কাল কতটুকু শান্তিপূর্ণ ছিল, জানি না। ১৯৪৫ সাল থেকে ‘প্যাক্স অ্যামেরিকানা’ নামে আমেরিকার অধীনে বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এবার সেই ধরনের একটি দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা ইসরায়েলের। ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ সে কারণে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে সীমিত ভাবা ভুল। এর প্রভাব ও উদ্দেশ্য সুদুরপ্রসারী। রক্তের বিনিময়ে ইরান এই চক্রান্ত ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সে দিক থেকে ভাবলে এ যুদ্ধ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে মুল্যায়িত হবে।