রঞ্জন কর্মকারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল একান্ত ব্যক্তিগত স্নেহ, শ্রদ্ধা ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার। বিভুদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি আমাদের পরিবারেরও একজন হয়ে উঠেছিলেন। আমার প্রতি তার আচরণ ছিল সবসময় অগ্রজের মতো—স্নেহশীল, আন্তরিক এবং পরামর্শদানে উদার। তাই তার প্রয়াণের খবর আমার কাছে শুধু একজন পরিচিত মানুষের চলে যাওয়া নয়; এটি এক দীর্ঘ সম্পর্ক, এক প্রজন্মের সামাজিক-সাংগঠনিক স্মৃতি এবং একজন সহযোদ্ধার বিদায়।
রঞ্জন কর্মকারের জীবনকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তিনি ছিলেন সংগঠক, সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, প্রশিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক—একাধিক পরিচয়ের মানুষ। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষমতা। বিচিত্র পেশা ও সামাজিক অবস্থানের মানুষকে একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যে একত্রিত করার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের সংগঠন ও প্রকল্প, যার অনেকগুলোই নিজ নিজ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
তবে তার দীর্ঘ কর্মজীবনকে শুধু সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হবে। এনজিও অঙ্গনে একসময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্যোগ ব্যাপক পরিচিতিও পায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার সংগঠনকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয় এবং সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তার জন্য সহজ হয়নি। একজন মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা ও কঠিন সময়গুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রঞ্জন কর্মকারের জীবনও সেই অর্থে সাফল্য, সংগ্রাম, বিতর্ক ও পুনর্মূল্যায়নের একটি বহুমাত্রিক অধ্যায়।
ছাত্রজীবন থেকেই ন্যায়, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তার গভীর বিশ্বাস পরবর্তী জীবনেও তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তার সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রেও তার কাজ ছিল উল্লেখযোগ্য। জেন্ডারকেন্দ্রিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সচেতনতার বিভিন্ন উদ্যোগকে এগিয়ে নেন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘উন্নয়ন পদক্ষেপ’ পত্রিকাটিও দীর্ঘদিন জেন্ডার, নারী অধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা ও সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এমন একটি প্রকাশনা চালু রাখা এবং এর বিষয়বৈচিত্র্য ধরে রাখা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী উদ্যোগ ছিল।
মানবাধিকার আন্দোলনেও রঞ্জন কর্মকারের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সমাজের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়; মানুষের মর্যাদা, অধিকার, অংশগ্রহণ এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি বিভিন্ন সংগঠন ও উদ্যোগকে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেছেন। উন্নয়ন সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এক সময় এনজিওতে থাকার কারণে রঞ্জনদার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তার অভিজ্ঞতা ও বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। তিনি কোনো বিষয়ে মতামত দিলে সেটি শুধু তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকত না; বাস্তবতা, মানুষের প্রয়োজন এবং সংগঠনের সক্ষমতার দিকগুলোও বিবেচনায় রাখতেন। তার এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তার অন্যতম শক্তি।
রঞ্জন কর্মকারের কর্মপরিসর এনজিও বা মানবাধিকার আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। সমাজের নানা অসংগতি, বৈষম্য ও সমকালীন বিষয় নিয়ে লিখেছেন। প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী ও সংগঠকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে তার সঙ্গে যাদের বিভিন্ন সময়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, তাদের কাছে তিনি একই সঙ্গে সংগঠক, শিক্ষক, সহকর্মী ও পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তার ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক ছিল মানুষের সঙ্গে সহজে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষমতা। বড় কোনো সংগঠনের দায়িত্বে থাকুন কিংবা ছোট কোনো উদ্যোগে—মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রবণতা তার মধ্যে সবসময়ই ছিল। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন পথ চলা মানুষেরা জানেন, তিনি নিজের মত ও আদর্শের বিষয়ে দৃঢ় ছিলেন। কখনো কখনো সেই দৃঢ়তা তাকে কঠিন অবস্থান নিতেও বাধ্য করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি তার ব্যক্তিগত মমত্ববোধ ছিল গভীর।
রঞ্জন কর্মকারকে স্মরণ করার সময় তাই শুধু তার পদ-পদবি কিংবা অর্জনের তালিকা মনে রাখলে তার প্রতি সুবিচার হবে না। তার জীবনকে দেখতে হবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বাংলাদেশের সামাজিক ও নাগরিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে—যেখানে সীমিত সম্পদ, নানা প্রতিকূলতা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যেও কিছু মানুষ সংগঠন তৈরি করেছেন, মানুষকে সচেতন করেছেন এবং অধিকার নিয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি করেছেন। রঞ্জন কর্মকার ছিলেন সেই প্রজন্মেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি।
আজ, ১২ আগস্ট ২০২৬, ঢাকার বিআরবি হাসপাতালে তার প্রয়াণের সংবাদ আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার ও নাগরিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও একটি শূন্যতা তৈরি হলো।
একজন মানুষ তার কাজের মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকেন। রঞ্জন কর্মকারও থাকবেন তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগে, তার লেখায়, প্রশিক্ষণ দেওয়া অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে এবং যাঁদের পাশে তিনি কোনো না কোনো সময়ে দাঁড়িয়েছেন তাঁদের মনে। তার কর্মজীবনের সাফল্য যেমন আমাদের অনুপ্রাণিত করবে, তেমনি তার সীমাবদ্ধতা ও কঠিন সময়গুলোও আমাদের মনে করিয়ে দেবে—কোনো মানুষের জীবনই একরৈখিক নয়।
রঞ্জন কর্মকার আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নে তার দীর্ঘ পথচলা এবং মানুষের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও গুণগ্রাহীদের প্রতি রইল আন্তরিক সমবেদনা। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক