আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীতে উত্তাপ ও আলোচনার কেন্দ্র এখন ঢাকা-১২ আসন। নির্বাচনে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা যেমন ভোটারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে, তেমনি নিরাপত্তা, ভয়ভীতি, সংঘাত ও কেন্দ্র দখলের আশঙ্কাও রয়েছে।
তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, হাতিরঝিল থানা ও শেরে বাংলা নগর থানার আংশিক নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার লড়ছে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থী। বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র মিলে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৫ জন প্রার্থী। এরমধ্যে রয়েছেন একজন নারী প্রার্থীও।
আলোচনায় তিন সাইফুল
তবে এই আসনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় সাইফুল নামের তিন প্রার্থী। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থীর নাম সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি সমর্থিত কোদাল প্রতীকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর নাম সাইফুল হক ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। ভোটারদের মতে, এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই ঢাকা-১২ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
এই আসনের মধ্যে রয়েছে রাজাবাজার, তেজতুরী বাজার, কারওয়ান বাজার, তেজকুনী পাড়া, নাখালপাড়া, আগারগাঁও, বেগুনবাড়ি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মগবাজার ও নয়াটলা এলাকা। এসব এলাকায় শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি।
ভোটাররা বলছেন, এ আসনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আসন থেকে আগে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। এছাড়াও এই আসনে অনেক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, শিল্প কলকারখানা এবং একটি বড় বাজার ও বাস-টার্মিনাল রয়েছে। এছাড়াও এই আসনে দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং মাদককারবারি বেশি। গত দেড় বছরে নানা সহিংসতায় এই আসনে বিভিন্ন দলের একাধিক নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে এই আসনে যিনি নির্বাচিত হয়ে আসবে, তাকে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
পশ্চিম নাখালপাড়ার বাসিন্দা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “আগে এখানে বিএনপির দুজন প্রার্থী ছিল। এখন একজন স্বতন্ত্র, একজন জোটের, আবার জামায়াতের প্রার্থীও শক্ত। তাই কাকে ভোট দেব, বুঝে উঠতে পারছি না।”
অনেক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলম নীরব, কোদাল প্রতীকের সাইফুল হক ও দাঁড়িপাল্লার সাইফুল আলম খান মিলনের মধ্যেই নির্বাচনের মূল লড়াই হবে। বিএনপির ভোট বিভক্ত হলে তার সুবিধা নিতে পারেন জামায়াত প্রার্থী— এমন আলোচনাও রয়েছে ভোটারদের মধ্যে।

কোদাল প্রতীকে সাইফুল হক
ভয় বা কালো টাকা ভোটারদের আটকাতে পারবে না— উল্লেখ্য করে বিএনপি সমর্থিত এই প্রার্থী শনিবার বিকেলে তেজকুনী পাড়া এলাকায় এক জনসভায় বলেন, ‘‘ঢাকা-১২ আসনে এবার দীর্ঘদিন পর ভোটারদের মধ্যে প্রকৃত উৎসাহ ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যাচ্ছে। প্রায় ১৭ বছর পর মানুষ নিজের পছন্দের দল ও প্রতীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলেই এই উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।’’
তবে নির্বাচনী পরিবেশ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয় বলেও জানান সাইফুল হক। তার অভিযোগ, নির্বাচনের দিকে দেশ যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই কিছু প্রার্থী ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি এবং কালো টাকা ছড়িয়ে ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। এসব বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন।
সাইফুল হক বলেন, ‘‘ঢাকা-১২ আসনের বড় অংশের ভোটার শিক্ষিত ও সচেতন। ফলে অবৈধ টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’’ তিনি জানান, বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। তার এক কিশোর সমর্থক ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছে, কোথাও পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে কোনো উসকানিতে নেতা-কর্মীদের পা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত এই প্রার্থী। তিনি বলেন, “আমরা অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই। মানুষের স্বাভাবিক আবেগকে আমরা ধরে রাখতে চাই।” প্রচার মিছিলে প্রতিদিন অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা-১২ আসনে ভোটকে ঘিরে একটি গণজাগরণ তৈরি হচ্ছে।

দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সাইফুল আলম খান মিলন
শনিবার দুপুরে নাখালপাড়া এলাকায় এক পথসভায় সাইফুল আলম মিলন জানান, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, যা তারা প্রত্যাশা করেননি। তার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে।
শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির প্রসঙ্গ টেনে মিলন বলেন, ‘‘অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর পেছনে মূল কারণ একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। জনগণের প্রকৃত ভোটাধিকার নিশ্চিত না হওয়াই এসব সংকটের মূল কারণ।’’
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মিলন বলেন, ‘‘নির্বাচনের দিন কেন্দ্র দখল বা সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’ তবে আইন হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নন জানিয়ে তিনি বিচারব্যবস্থা দলীয়করণের কড়া সমালোচনা করেন।
সংবিধান প্রসঙ্গে মিলন বলেন, ‘‘গত ৫৩ বছরে কার্যকর থাকা সংবিধান জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে।’’ জনগণের মালিকানায় নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবিও তোলেন তিনি। ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘শুধু ভোট দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়— ভোটাধিকার রক্ষায় ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতেও হবে।’’
ফুটবল প্রতীকে সাইফুল আলম নীরব
শনিবার সন্ধ্যায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার কলোনি বাজারে নির্বাচনী জনসভা করেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব। তার প্রচারে বারবার সামনে এসেছে ‘এই এলাকার সন্তান’ পরিচয়। তিনি বলেন, এই এলাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কারণে ভোটারদের সঙ্গে তার আবেগি সম্পর্ক রয়েছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের কারণে তাকে একাধিকবার মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

শহীদ জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শ ধারণ করে রাজনীতি করার কথা উল্লেখ করে নীরব বলেন, “নির্বাচন এলেই কিছু অতিথি পাখি আসে। যারা এই মাটিতে জন্মায়নি, এই মাটিতে আন্দোলন করেনি। এই এলাকার মানুষ কখনও তাদের ভোট দেবে না।” নীরব দাবি, ‘‘এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক না থাকলেও ধানের শীষের ভোট বাস্তবে ফুটবল প্রতীকেই পড়বে।’’
কর্মী-সমর্থকদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি এবং ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে অভিযোগ করে সাইফুল আলম নীরব বলেন, ‘‘ফুটবল প্রতীকের প্রতি গণজোয়ার তৈরি হওয়ায় কিছু রাজনৈতিক পক্ষ সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে, যাতে তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারে।’’ এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
একমাত্র নারী প্রার্থী মাথাল প্রতীকে তাসলিমা আখতার
এই আসনে মাথাল প্রতীকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার। গতকাল শনিবার দুপুরে তেজগাঁও কলেজে এক পথসভায় তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতা না হলেও নির্বাচনী মাঠে শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। তার বিলবোর্ড নামিয়ে দেওয়ার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য শুরু হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি প্রশাসনিক সহযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই প্রার্থী।

তাসলিমা আখতার বলেন, ‘‘বিলবোর্ড নামানোর ঘটনায় প্রশাসনকে জানানো হলেও কী ধরনের প্রতিকার নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।’’ ঢাকা-১২ আসনের প্রধান সমস্যা হিসেবে তিনি চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদককে চিহ্নিত করেন। নারী, শ্রমিক ও তরুণদের পক্ষে কাজ করতেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বলে জানান।
সর্বোচ্চ প্রার্থীর আসন ঢাকা-১২
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে— এবারের নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে ত্রিমুখী লড়াইয়ের তিন সাইফুল।
এই আসনে লড়ছেন ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের আবুল বাশার চৌধুরী, কাস্তে প্রতীকে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কল্লোল বনিক, মাথাল প্রতীকে গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার, কলম প্রতীকে জনতার দলের ফরিদ আহমেদ, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান, ছড়ি প্রতীকে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মুনতাসির মাহমুদ, আপেল প্রতীকে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোছা. সালমা আক্তার, সিংহ প্রতীকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) মোমিনুল আমিন, কাঁঠাল প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নাঈম হাসান, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ শাহজালাল, প্রজাপতি প্রতীকে আমজনতার দলের মো. তারেক রহমান ও লাঙল প্রতীকে জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার উপস্থিতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের ভোটের ধারা এই আসনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে ঢাকা-১২ আসনের নির্বাচন শুধু ব্যক্তি বা দলের লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভোটাধিকার, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।