ঢাকা-১২ আসনের অন্যতম তিন প্রতিদ্বন্দ্বী। ছবি: এআই দিয়ে বানানো
সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর আলোচিত আসনগুলোর একটি ঢাকা-১২। তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, হাতিরঝিল থানা ও শেরে বাংলা নগর থানার আংশিক নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার লড়ছেন সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ১৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন।
তবে এই আসনে আলোচনায় রয়েছেন তিন ‘সাইফুল’। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি সমর্থিত কোদাল প্রতীকে বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর সাইফুল হক এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
ভোটারদের মতে, এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই ঢাকা-১২ আসনে ত্রিমুখী লড়াই চলছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে, কোদাল প্রতীকের সাইফুল হক ও ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলমের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি লড়াই, সংঘর্ষ ও রেষারেষি। আর এই সুযোগের প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে যাচ্ছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সাইফুল আলম খান।
ভোট ঘিরে ভোটারদের মধ্যে যেমন উদ্দীপনা রয়েছে, তেমনি নিরাপত্তাহীনতা, ভয়ভীতি, সংঘাত, কালো টাকা ও কেন্দ্র দখলের আশঙ্কাও ঘিরে ধরেছে এই আসনকে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ঢাকা-১২ হয়ে উঠছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ঢাকা-১২ আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাগরিক সেবার সংকটই এবার ভোটের বড় ইস্যু। কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড ও মহাখালী বাস টার্মিনাল-এই তিন এলাকাকে ঘিরে অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। ভোটাররা বলছেন, শহরের ভেতরে এসব স্থাপনা থাকায় যানজট, নাগরিক ভোগান্তির পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সংঘর্ষ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এই তিন এলাকায় প্রতি দিন কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। গত ৭ জানুয়ারি রাতে কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মোসাব্বির হত্যাকাণ্ড সমস্যাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ভোটার জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই আসনের প্রতিনিধিরা দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মদদ দিয়ে আসছে। মাদককের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এই আসনের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা। চাঁদাবাজির অভিযোগে গত দেড় বছরে অন্তত শতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবুও থামছে না চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য।
এ আসনের ভোটার তেজতুরী বাজার এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন রুবেল চরচাকে বলেন, “আমরা চাই এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবেন। পরিকল্পিতভাবে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন। যে প্রার্থী এসব বিষয়ে কথা বলছেন এবং এলাকার বাস্তবতা জানেন, মানুষ তার দিকেই ঝুঁকছে।”
রুবেল আরও বলেন, “এই আসনে সব চেয়ে বড় সমস্যা কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল। এই তিনটি জায়গা ঘিরে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং দখলবাজির পাশাপাশি নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে করে মারামারি থেকে শুরু করে খুনাখুনির ঘটনাও বাড়ছে। আমরা এসব সমস্যার সমাধান চাই।”
আরেক ভোটার রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার বলেন, “আমরা এই এলাকায় অনেক বছর ধরে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি দেখছি। যিনি এলাকার মানুষ, যিনি এখানে বড় হয়েছেন, তিনিই এসব সমস্যা সঠিকভাবে বুঝবেন। প্রার্থী যদি সত্যিই মানুষের পাশে থাকেন, তাহলে তাকে ভোট দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৯ জন, নারী ভোটার এক লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
সাইফুল আলম নীরবের প্রচার। ছবি: ফেসবুক
তিন ‘সাইফুল’-এর লড়াই
এই আসনে ১৫ জন প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে মূল আলোচনায় রয়েছেন ‘সাইফুল’ নামের তিন প্রার্থী। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হক, এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
ভোটারদের মতে, এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই ঢাকা-১২ আসনে কার্যত ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কোদাল ও ফুটবল প্রতীকের মধ্যে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে, সেখানে দাঁড়িপাল্লা তুলনামূলকভাবে ‘ফাঁকা মাঠে’ রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীররেও বিরুদ্ধে কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এবং মহাখালী বাস টার্মিনালের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি নিজেকে এলাকার ‘মাটির সন্তান’ হিসেবে তুল ধরেছেন। তার ভাষায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত সব সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন।
সাইফুল আলম নীরর চরচাকে বলেন, “আমি এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছি, এই মাটিতে বড় হয়েছি। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে শহীদ জিয়ার আদর্শকে বুকে ধারণ করে প্রায় ৪৫ বছর রাজনীতি করছি। মামলা খেয়েছি, জেল খেটেছি। আজও সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।”
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দল তাকে বহিষ্কার করলেও শহীদ জিয়ার আদর্শ কেউ তার বুক থেকে কেড়ে নিতে পারেনি। তার ভাষায়, “যেহেতু এখানে ধানের শীষ নেই, তাই ফুটবলই ধানের শীষ। ধানের শীষ মানেই ফুটবল।”
নীরবের দাবি, বিএনপির আদর্শিক ভোটারদের বড় অংশ তার দিকেই ঝুঁকছে। তিনি বলেন, “বিএনপি যাকে সমর্থন দিয়েছে, সে একদিনও বলেনি যে সে শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে রাজনীতি করেন। তাহলে জিয়ার সৈনিকরা তাকে কেন ভোট দেবে?”
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস ইস্যুতে নীরব সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “একজন প্রার্থীর পেছনে চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা কাজ করছে-সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারের ঘটনায় বড় এক চাঁদাবাজ ওই প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণার কাজ করছে।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তিনি ‘নির্বাচনী অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন। তার ভাষায়, “চাঁদাবাজির কারণে কোনো হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি না, সেটা পুলিশ বলতে পারবে। আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই।”
বিএনপি সমর্থিত কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হক পাল্টা অভিযোগ তুলছেন ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। তার দাবি, নির্বাচনী মাঠে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “গত কয়েক দিনে আমাদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন, কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি। আমরা হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছি, কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
সাইফুল হকের অভিযোগ, “আমাদের প্রচারণার মাইক ভাঙচুর, ব্যানার ছেঁড়া ও হুমকি দেওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াতে দেখছি না।”
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, কালো টাকা দিয়ে ভোট প্রভাবিত করার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরছেন কোদাল প্রতীকের এই প্রার্থী। তিনি বলেন, “আমরা খবর পাচ্ছি-টাকার বস্তা নিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ টাকা দিয়ে ভোট কিনতে এলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে। যারা কেন্দ্রে দখল করতে আসবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।”
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাইফুল হক বলেন, “আমাদের ওপর হামলা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। ইসির পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাদের আরও সক্রিয় হওয়ারও আহ্বান জানান এই প্রার্থী।”
সাইফুল আলম খান মিলনের পথসভা। ছবি: ফেসবুক
দাঁড়িপাল্লার অবস্থান: পরিবর্তনের বার্তা
কোদাল-ফুটবলের দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন পরিবর্তনের রাজনীতির কথা বলছেন। তার দাবি, মানুষ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির অবসান চায়। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষাও ছিল মৌলিক পরিবর্তন।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নির্বাচনে মানুষের সাড়া ও উৎসাহের মূল কারণ হলো-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের চাওয়াও ছিল এই মৌলিক পরিবর্তন।
ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ভোটকেন্দ্রে সতর্ক অবস্থানে থাকবে এবং সরকারসহ রাষ্ট্রের সব সংস্থার কাছেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা রয়েছে।”
মিলন অভিযোগ করেন, কিছু এলাকায় টাকা ছড়ানো, অস্ত্র কেনা ও গোপন বৈঠকের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি।
কালো টাকা দিয়ে ভোটারদের কেনা হচ্ছে এবং কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা চলছে অভিযোগ করে জামায়াতের এই প্রার্থী বলেন, “যারা কেন্দ্র দখল করতে চায়, তারাই ফলাফল মানতে চায় না। আমরা বলছি- সুষ্ঠু ভোট হোক, ফল যাই হোক, সবাই মেনে নেব। গত ১৫ বছরে আমরা বাক্স ভর্তি নির্বাচন দেখেছি। আমরা সেটা চাই না। আমরা শুধু চাই-মানুষকে ভোট দিতে দিন, কেন্দ্র দখল করবেন না।”
সব মিলিয়ে ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন কেবল প্রতীকের লড়াই নয়, চলেছে অতীত রাজনীতি, নাগরিক সংকট ও নিরাপত্তা প্রশ্নে এক জটিল প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন, তা নির্ধারণ করবে ভোটের বাক্স। অনেকেই বলছেন, ঢাকা-১২ আসনের ফলাফল রাজধানীর রাজনীতিতে বড় বার্তা দেবে।
ঢাকা-১২ আসনের অন্যতম তিন প্রতিদ্বন্দ্বী। ছবি: এআই দিয়ে বানানো
সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর আলোচিত আসনগুলোর একটি ঢাকা-১২। তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা, হাতিরঝিল থানা ও শেরে বাংলা নগর থানার আংশিক নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার লড়ছেন সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ১৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন।
তবে এই আসনে আলোচনায় রয়েছেন তিন ‘সাইফুল’। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি সমর্থিত কোদাল প্রতীকে বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর সাইফুল হক এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
ভোটারদের মতে, এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই ঢাকা-১২ আসনে ত্রিমুখী লড়াই চলছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে, কোদাল প্রতীকের সাইফুল হক ও ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলমের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি লড়াই, সংঘর্ষ ও রেষারেষি। আর এই সুযোগের প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে যাচ্ছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সাইফুল আলম খান।
ভোট ঘিরে ভোটারদের মধ্যে যেমন উদ্দীপনা রয়েছে, তেমনি নিরাপত্তাহীনতা, ভয়ভীতি, সংঘাত, কালো টাকা ও কেন্দ্র দখলের আশঙ্কাও ঘিরে ধরেছে এই আসনকে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ঢাকা-১২ হয়ে উঠছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ঢাকা-১২ আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাগরিক সেবার সংকটই এবার ভোটের বড় ইস্যু। কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড ও মহাখালী বাস টার্মিনাল-এই তিন এলাকাকে ঘিরে অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। ভোটাররা বলছেন, শহরের ভেতরে এসব স্থাপনা থাকায় যানজট, নাগরিক ভোগান্তির পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সংঘর্ষ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এই তিন এলাকায় প্রতি দিন কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। গত ৭ জানুয়ারি রাতে কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মোসাব্বির হত্যাকাণ্ড সমস্যাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ভোটার জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই আসনের প্রতিনিধিরা দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মদদ দিয়ে আসছে। মাদককের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এই আসনের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা। চাঁদাবাজির অভিযোগে গত দেড় বছরে অন্তত শতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবুও থামছে না চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য।
এ আসনের ভোটার তেজতুরী বাজার এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন রুবেল চরচাকে বলেন, “আমরা চাই এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবেন। পরিকল্পিতভাবে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন। যে প্রার্থী এসব বিষয়ে কথা বলছেন এবং এলাকার বাস্তবতা জানেন, মানুষ তার দিকেই ঝুঁকছে।”
রুবেল আরও বলেন, “এই আসনে সব চেয়ে বড় সমস্যা কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল। এই তিনটি জায়গা ঘিরে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং দখলবাজির পাশাপাশি নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে করে মারামারি থেকে শুরু করে খুনাখুনির ঘটনাও বাড়ছে। আমরা এসব সমস্যার সমাধান চাই।”
আরেক ভোটার রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার বলেন, “আমরা এই এলাকায় অনেক বছর ধরে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি দেখছি। যিনি এলাকার মানুষ, যিনি এখানে বড় হয়েছেন, তিনিই এসব সমস্যা সঠিকভাবে বুঝবেন। প্রার্থী যদি সত্যিই মানুষের পাশে থাকেন, তাহলে তাকে ভোট দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৯ জন, নারী ভোটার এক লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
সাইফুল আলম নীরবের প্রচার। ছবি: ফেসবুক
তিন ‘সাইফুল’-এর লড়াই
এই আসনে ১৫ জন প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে মূল আলোচনায় রয়েছেন ‘সাইফুল’ নামের তিন প্রার্থী। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হক, এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
ভোটারদের মতে, এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই ঢাকা-১২ আসনে কার্যত ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কোদাল ও ফুটবল প্রতীকের মধ্যে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে, সেখানে দাঁড়িপাল্লা তুলনামূলকভাবে ‘ফাঁকা মাঠে’ রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীররেও বিরুদ্ধে কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এবং মহাখালী বাস টার্মিনালের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি নিজেকে এলাকার ‘মাটির সন্তান’ হিসেবে তুল ধরেছেন। তার ভাষায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত সব সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন।
সাইফুল আলম নীরর চরচাকে বলেন, “আমি এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছি, এই মাটিতে বড় হয়েছি। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে শহীদ জিয়ার আদর্শকে বুকে ধারণ করে প্রায় ৪৫ বছর রাজনীতি করছি। মামলা খেয়েছি, জেল খেটেছি। আজও সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।”
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দল তাকে বহিষ্কার করলেও শহীদ জিয়ার আদর্শ কেউ তার বুক থেকে কেড়ে নিতে পারেনি। তার ভাষায়, “যেহেতু এখানে ধানের শীষ নেই, তাই ফুটবলই ধানের শীষ। ধানের শীষ মানেই ফুটবল।”
নীরবের দাবি, বিএনপির আদর্শিক ভোটারদের বড় অংশ তার দিকেই ঝুঁকছে। তিনি বলেন, “বিএনপি যাকে সমর্থন দিয়েছে, সে একদিনও বলেনি যে সে শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে রাজনীতি করেন। তাহলে জিয়ার সৈনিকরা তাকে কেন ভোট দেবে?”
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস ইস্যুতে নীরব সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “একজন প্রার্থীর পেছনে চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা কাজ করছে-সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারের ঘটনায় বড় এক চাঁদাবাজ ওই প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণার কাজ করছে।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তিনি ‘নির্বাচনী অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন। তার ভাষায়, “চাঁদাবাজির কারণে কোনো হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি না, সেটা পুলিশ বলতে পারবে। আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই।”
বিএনপি সমর্থিত কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হক পাল্টা অভিযোগ তুলছেন ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। তার দাবি, নির্বাচনী মাঠে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “গত কয়েক দিনে আমাদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন, কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি। আমরা হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছি, কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
সাইফুল হকের অভিযোগ, “আমাদের প্রচারণার মাইক ভাঙচুর, ব্যানার ছেঁড়া ও হুমকি দেওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াতে দেখছি না।”
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, কালো টাকা দিয়ে ভোট প্রভাবিত করার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরছেন কোদাল প্রতীকের এই প্রার্থী। তিনি বলেন, “আমরা খবর পাচ্ছি-টাকার বস্তা নিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ টাকা দিয়ে ভোট কিনতে এলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে। যারা কেন্দ্রে দখল করতে আসবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।”
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাইফুল হক বলেন, “আমাদের ওপর হামলা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। ইসির পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাদের আরও সক্রিয় হওয়ারও আহ্বান জানান এই প্রার্থী।”
সাইফুল আলম খান মিলনের পথসভা। ছবি: ফেসবুক
দাঁড়িপাল্লার অবস্থান: পরিবর্তনের বার্তা
কোদাল-ফুটবলের দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন পরিবর্তনের রাজনীতির কথা বলছেন। তার দাবি, মানুষ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির অবসান চায়। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষাও ছিল মৌলিক পরিবর্তন।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নির্বাচনে মানুষের সাড়া ও উৎসাহের মূল কারণ হলো-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের চাওয়াও ছিল এই মৌলিক পরিবর্তন।
ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ভোটকেন্দ্রে সতর্ক অবস্থানে থাকবে এবং সরকারসহ রাষ্ট্রের সব সংস্থার কাছেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা রয়েছে।”
মিলন অভিযোগ করেন, কিছু এলাকায় টাকা ছড়ানো, অস্ত্র কেনা ও গোপন বৈঠকের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি।
কালো টাকা দিয়ে ভোটারদের কেনা হচ্ছে এবং কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা চলছে অভিযোগ করে জামায়াতের এই প্রার্থী বলেন, “যারা কেন্দ্র দখল করতে চায়, তারাই ফলাফল মানতে চায় না। আমরা বলছি- সুষ্ঠু ভোট হোক, ফল যাই হোক, সবাই মেনে নেব। গত ১৫ বছরে আমরা বাক্স ভর্তি নির্বাচন দেখেছি। আমরা সেটা চাই না। আমরা শুধু চাই-মানুষকে ভোট দিতে দিন, কেন্দ্র দখল করবেন না।”
সব মিলিয়ে ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন কেবল প্রতীকের লড়াই নয়, চলেছে অতীত রাজনীতি, নাগরিক সংকট ও নিরাপত্তা প্রশ্নে এক জটিল প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন, তা নির্ধারণ করবে ভোটের বাক্স। অনেকেই বলছেন, ঢাকা-১২ আসনের ফলাফল রাজধানীর রাজনীতিতে বড় বার্তা দেবে।