সুইডেনে আর মাত্র কয়েক দিন পর হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। পার্লামেন্ট (রিক্সদগ) নির্বাচনের পাশাপাশি একই সঙ্গে হবে আঞ্চলিক (রিজিওন) ও পৌর (কমিউন) পরিষদের নির্বাচন। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী। তারা কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পার্লামেন্ট (রিক্সদগ), কেউ আঞ্চলিক ও স্থানীয় পরিষদে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারও এক নয়।
মডারেট (মদারেতনা) পার্টির প্রার্থীদের প্রচারণায় নিরাপত্তা, কাজ ও দায়িত্বশীলতা, স্থানীয় উন্নয়ন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভ্যান্সটার পারিয়েতের প্রার্থীদের প্রচারণায় সামাজিক সমতা, শ্রমিক অধিকার, কল্যাণ, মানবাধিকার ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জনসেবার ওপর জোর দিচ্ছেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের জন্য এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা একদিকে যেমন রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ, তেমনি সুইডেনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কতটা বাড়ছে, সেটিও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন ফারজানা খান, লিও আহমেদ ও মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
ফারজানা খান
ফারজানা খান স্টকহোমের সালেম থেকে সুইডিশ সরকারে থাকা মডারেট (মদারেতনা) পার্টির হয়ে পার্লামেন্ট (রিক্সদগ) ও পৌর (কমিউন) পরিষদ—দুই নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
২৫ বছরের বেশি সময় সামাজিক সেবায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে ফারজানা খানের। তিনি মডারেট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার প্রচারণায় নিরাপত্তা, সামাজিক একীভূতকরণ, কর্মসংস্থান ও ভাষার গুরুত্ব উঠে এসেছে।নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সমাজে অবদান রাখার সুযোগ, আইন মেনে চলা, অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে সহিংসতা প্রতিরোধেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
লিও আহমেদ
লিও আহমেদ। তিনি লেফট পার্টি বা ভ্যান্সটারপারিয়েতের হয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৩৪ নম্বর প্রার্থী। একই দলের হয়ে সিগতুনা পৌর (কমিউন) পরিষদে তিনি ১ নম্বর প্রার্থী।
প্রায় দুই দশক ধরে সুইডেনের অভিবাসননীতি ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় তিনি। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অভিবাসননীতির কারণে পরিবার, শিশু ও তরুণদের ওপর প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
স্টকহোমের নিকটবর্তী শহর উপসালা থেকে পার্লামেন্ট ও পৌর (কমিউন) পরিষদ—দুই নির্বাচনেই প্রার্থী হয়েছেন মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। ভোটারদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আগাম ভোট দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। ভোটের প্রস্তুতি, ভোটারদের তথ্য এবং কীভাবে আগাম ভোট দেওয়া যায়— এসব বিষয়েও প্রচারণা চালাচ্ছেন।
আঞ্চলিক পরিষদের প্রার্থী
মুহিবুল এজদানি খান
জাতীয় ও পৌর পরিষদের পাশাপাশি রিজিওন কাউন্সিলেও (আঞ্চলিক পরিষদ) রয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী। মুহিবুল এজদানি খান ভ্যান্সটারপারিয়েতের হয়ে স্টকহোম রিজিওন কাউন্সিল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার নির্বাচনী এলাকার মধ্যে রয়েছে ব্রোম্মা-কুংশহোলমেন, সিক্স ইউতেরে ভ্যাস্ত এবং নুরভ্যাস্ত ও নুরঅস্ত।
সুইডেনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে মুহিবুল এজদানি খানের। তিনি ২০১০ ও ২০২২ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। এ ছাড়া ২০০৬ ও ২০১৪ সালে রিজিওন কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনে দীর্ঘ সময় সুইডিশ পোস্ট ট্রেড ইউনিয়নের স্টকহোম সাউথ শাখার নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।
দীপক কুন্ডু
দীপক কুন্ডু মডারেট পার্টির হয়ে স্টকহোম রিজিওন কাউন্সিল নির্বাচনে ১৯ নম্বর প্রার্থী। তার প্রচারণায় কর্মসংস্থান, দায়িত্বশীলতা, জননিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
হারুন চৌধুরী
আঞ্চলিক ও স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হারুন চৌধুরী। তিনি জারফাল্লা পৌরসভা এবং স্টকহোম রিজিওন— উভয় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুইডিশ রাজনীতির সঙ্গে তিনি যুক্ত বলে জানিয়েছেন হারুন চৌধুরী। এই সময়ে তিনি রিক্সদগের সাপ্লিমেন্টারি সদস্য, স্টকহোম রিজিওনের রিজিওন কাউন্সিলর এবং জারফাল্লা পৌরসভার একাধিকবার পৌর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পৌর পরিষদের প্রার্থী
তাওহিদ আমানুল্লাহ
স্থপতি তাওহিদ আমানুল্লাহ ভ্যান্সটারপারিয়েতের হয়ে সুন্দবিবেরি পৌর পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তার প্রচারণায় কল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সমতা, সংহতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
শিমুল সানাউল্লাহ
শিমুল সানাউল্লাহ মডারেট পার্টির হয়ে সোলেনতুনা পৌর পরিষদ নির্বাচনে ২৩ নম্বর প্রার্থী।
স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে সামনে রেখেছেন তিনি। শিশুদের জন্য ভালো শিক্ষার পরিবেশ, নিরাপদ ও মানসম্মত প্রবীণসেবা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্থানীয় কমিউনিটি শক্তিশালী করার কথা বলছেন শিমুল।
আফতাব জাইগিরদার
আফতাব জাইগিরদার পেশায় মাতৃভাষা শিক্ষক। তিনি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টির হয়ে বুতশিরকা পৌর পরিষদ নির্বাচনে ৩৩ নম্বর প্রার্থী।
শিক্ষাই তার প্রচারণার মূল বিষয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আরও ভালো সুযোগ নিশ্চিত করতে বেশি শিক্ষক এবং ছোট শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
মো. আরিফ হোসেন মজুমদার
মো. আরিফ হোসেন মজুমদার মডারেট পার্টির হয়ে তেবি পৌর পরিষদ নির্বাচনে ৩৭ নম্বর প্রার্থী। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সেবা, প্রবীণসেবা, নিরাপত্তা ও স্থানীয় ব্যবসার উন্নয়ন তার প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবায় ১৪ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিশেষ করে এলএসএস ও সামাজিক মনোরোগসেবায় কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বনির্ভর জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।