বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করে সেগুলোকে ‘দলীয় ক্লাবে’ পরিণত করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।
সরকারের ক্ষমতার প্রথম ১৮০ দিনের ‘ব্যর্থতা ও সার্বিক চিত্র’ তুলে ধরে তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে।
আজ সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন নাহিদ।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন—অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সরকারকে বিভিন্ন খাতে ব্যর্থতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতাসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
নাহিদ বলেন, “সরকার আসার পরই ভয়াবহ জ্বালানি তেল সংকট শুরু হয়েছিল। সে সময় জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছিল। এতে গণপরিবহন, সেচ, সারসহ সব খাতে প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদার ৪৩ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা শহরে চুলা জ্বলছে না। শিল্প কারখানার উৎপাদন কমেছে।”
নাহিদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্রয়াদেশও চলে যাচ্ছে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে ক্রয়াদেশ চলে যাচ্ছে। সরকার অঙ্গীকার করেছিল ক্ষমতাগ্রহণের দুই বছর বিদ্যুৎতের দাম বাড়াবে না। কিন্তু দুই মাসেই দাম বাড়ালো। এছাড়া লোডশেডিং, ভুতুড়ে বিল আসছে। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই সুপারিশ মানা হচ্ছে না। বর্তমানে কোনো সংকট হলে হয় ফ্যাসিস্ট না হয় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। অথচ এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল।”
এনসিপির প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ খাতে লোডশেডিং ও ভূতুড়ে বিলের অভিযোগের পাশাপাশি সরকারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে নাহিদ বলেন, গত ছয় মাসে দেশের ১৯ থেকে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় মতাদর্শের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৬৩টি জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে দলীয় ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে। তিনি বলেন, “এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোকে নির্বাচন বা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।”
এনসিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের মধ্যে ১৯ জনের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের অভিযোগ করা হয়েছে।
কৃষি খাতের সংকটের কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন নাহিদ। তিনি বলেন, “কৃষক সার পাচ্ছে না। বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। স্বাস্থ্যখাতে হাম মহামারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে, কিন্তু সংকট এখনো কাটেনি। কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল গঠন করা হয়নি। শিক্ষাঙ্গন দখল করা হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিরোধী মতাদর্শের ওপর হামলা হলেও কোনো বিচার হয়নি।”
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “৬ মাসে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৬৭০টি ঘটিয়েছে বিএনপি। দেশের বিভিন্ন স্থানে এনসিপির নেতা-কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন।”
এনসিপির ১৮০ দিনের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য বিএনপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
সরকার গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করেছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, “আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি, সরকার গণভোটের গণরায়কে প্রত্যাখান করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।”