এবারের নির্বাচনে কোটিপতি ও ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর সংখ্যায় রেকর্ড: টিআইবি

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
এবারের নির্বাচনে কোটিপতি ও ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর সংখ্যায় রেকর্ড: টিআইবি
টিআইবির সংবাদ সম্মেলন। ছবি: চরচা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ জন চূড়ান্ত প্রার্থীর মধ্যে ৫৬০ জনই কোটিপতি (শুধুমাত্র অস্থাবর সম্পদের ভিত্তিতে), যা মোট প্রার্থীর প্রায় ২৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এছাড়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজার মূল্য বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৯১ জনে।

প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানিয়েছে টিআইবি। এক সংবাদ সম্মেলনে আজ বৃহস্পতিবার টিআইবি তাদের ‘নো ইওর ক্যান্ডিডেট’ ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে এই তথ্য তুলে ধরে।

ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ও বিপুল ঋণ

টিআইবির তথ্যে, এবারের নির্বাচনেও প্রার্থীদের প্রধান পেশা হিসেবে ব্যবসার প্রাধান্য বজায় রয়েছে; প্রায় ৪৮ শতাংশ প্রার্থীই ব্যবসায়ী। বিপরীতে গত পাঁচটি নির্বাচনের তুলনায় আইনজীবী ও শিক্ষকদের হার কিছুটা বেড়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রার্থীদের ঋণের পরিমাণ; মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এটি গত দ্বাদশ নির্বাচনের চেয়ে ২ হাজার কোটি টাকা বেশি। মোট প্রার্থীর ২৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত এবং ৬৭ শতাংশ প্রার্থীর ব্যাংক ঋণ রয়েছে।

শীর্ষ সম্পদশালী ও জমির পাহাড়

হলফনামা অনুযায়ী, অস্থাবর সম্পদে শীর্ষ ১০ জনই শতকোটিপতি। তালিকার শীর্ষে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, যার ঘোষিত অস্থাবর সম্পদ ৫৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া আব্দুল আউয়াল মিন্টুর সম্পদের পরিমাণ ৬০৭ কোটি টাকা (স্থাবর-অস্থাবর মিলে)। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, অন্তত ৭৭৫ জন প্রার্থীর এক একরের বেশি জমি আছে। তবে অনেক প্রার্থী আইনি সীমা (১০০ বিঘা) অতিক্রম করে বিপুল জমির মালিক হয়েছেন। যেমন- চট্টগ্রাম-১৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আব্বাসের মোট জমির পরিমাণ ১ হাজার ২৯০ একর।

দলভিত্তিক অংশগ্রহণ ও নারী প্রতিনিধিত্ব

নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ২৮৮ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এরপর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৪৯ জন। এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য দিক— ইসলামী দলগুলোর প্রার্থীর হার বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তবে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ এবারও অত্যন্ত নগণ্য, মাত্র ৪ দশমিক ০২ শতাংশ, যা গত তিনটি নির্বাচনের চেয়েও কম। প্রার্থীদের গড় বয়স কমে ৫১ বছরে দাঁড়িয়েছে, যা তরুণদের আগ্রহের প্রতিফলন বলে মনে করছে টিআইবি।

তথ্য গোপন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান হলফনামার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, অন্তত ২১ জন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য দিলেও নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী আরও অনেকেই এই তথ্য গোপন করেছেন। এছাড়া বিদেশে সম্পদ, ফ্ল্যাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্যও অনেকে হলফনামায় উল্লেখ করেননি।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয় যে, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হলফনামার তথ্য যাচাইয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না।

টিআইবি দাবি করে, হলফনামায় ভুল তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমার অতিরিক্ত জমি রাষ্ট্র কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করে ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা উচিত।

টিআইবি উল্লেখ করেছে, রাজনীতি বর্তমানে অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা সুস্থ রাজনীতির পথকে সংকুচিত করছে।

সম্পর্কিত