ফাহমিদা শিকদার

চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন দুনিয়ায় নিকোল কিডম্যানের আধিপত্য নতুন কিছু নয়। ‘নাইন পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স’ এবং ‘বেবিগার্ল’-এর মতো হিট কাজগুলো থেকে বছরে কোটি কোটি ডলার আয় করছেন তিনি। হলিউডের এই জনপ্রিয় তারকা বর্তমানে নতুন এক পেশায় নামতে চলেছেন। তবে তার নতুন এই কাজটি আগের মতো গ্ল্যামারাস নয়, অর্থপ্রাপ্তিও অনেক কম, কিন্তু সম্ভবত মানুষের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। রূপালি পর্দার জৌলুস ঝেড়ে ফেলে তিনি মুখোমুখি হচ্ছেন জীবনের সবচেয়ে অমোঘ বাস্তবতার সামনে। আর তা হলো মৃত্যু। সম্প্রতি নিকোল একজন ‘ডেথ ডুলা’ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
ডেথ ডুলাকে ‘ডেথ কম্প্যানিয়ন’ বা মৃত্যুসঙ্গীও বলা হয়। এই খাতের সাথে জড়িতরা বলছেন, খণ্ডিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির এই সময়ে যখন মানুষ শেষ জীবনে এসে সহায়হীন হয়ে পড়ে, তখন এই ধরনের ভূমিকা দিন দিন আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এক অনুষ্ঠানে কিডম্যান বলেন, “আমার মা যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিলেন, তিনি খুব একাকী বোধ করছিলেন। পরিবারের পক্ষে যতটুকু সেবা দেওয়া সম্ভব ছিল তারও একটা সীমা ছিল। আমার বোন এবং আমার অনেকগুলো সন্তান, আমাদের ক্যারিয়ার এবং কাজ–সব মিলিয়ে আমরা চেয়েছিলাম মায়ের দেখাশোনা করতে, কারণ বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই। তখনই আমার মনে হয়েছিল, ইশ! পৃথিবীতে যদি এমন কিছু মানুষ থাকত, যারা নিরপেক্ষভাবে পাশে বসে শুধু সান্ত্বনা আর সেবাটুকু দিতে পারত।”

ডেথ ডুলা-রা হলেন ঠিক তেমনই মানুষ, আর এই পেশার প্রতি আগ্রহী হওয়ার তালিকায় কিডম্যান একা নন। ‘হ্যামনেট’ খ্যাত পরিচালক ক্লোয়ি ঝাও মৃত্যুভয় কাটিয়ে উঠতে ডেথ ডুলা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এমনকি অতি সম্প্রতি ‘দ্য পিট’ সিরিজের একটি কাহিনিসূত্রেও ডেথ ডুলা হিসেবে একটি চরিত্রকে দেখা গেছে।
মৃত্যুপথযাত্রীদের নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মতে, জীবনের শেষ দিনগুলোতে অন্যদের পথপ্রদর্শক হওয়ার বিষয়ে তারকাদের এই আগ্রহ মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। এটি আসলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই অংশ, যার মাধ্যমে তারা মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে চাইছেন। মৃত্যু মানুষের অস্তিত্বের এক অনিবার্য সত্য, যা সমসাময়িক আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ডেথ ডুলা প্রশিক্ষণ সংস্থা ‘গোয়িং উইথ গ্রেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা আলুয়া আর্থার মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ভক্সকে বলেন, “এটি এমন এক বিষয়, যা নিয়ে আমাদের সবাইকে লড়তে হয়। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে চুপ ছিলাম।”
ডেথ ডুলা আসলে কী করেন
ইন্টারন্যাশনাল এন্ড-অব-লাইফ ডুলা অ্যাসোসিয়েশন (আইনিল্ডা)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, একজন ‘এন্ড-অব-লাইফ ডুলা’ (জীবনাবসানকালীন সহযাত্রী) হলেন এমন একজন সঙ্গী, যিনি মৃত্যু, শোক ও নশ্বরতার মুখোমুখি হওয়া কোনো ব্যক্তি, তার পরিবার এবং তাদের সেবা-যত্নকারীদের এই কঠিন সময়টি পার করতে ব্যক্তিগত ও সহানুভূতিশীল সমর্থন জোগান। মৃত্যুর প্রক্রিয়াজুড়ে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এই ডুলা রোগীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেন এবং তাকে মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয়, আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক সেবা প্রদান করেন।
শোকাচ্ছন্ন অবস্থা এবং প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা সামলে ওঠার পাশাপাশি, মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনের যত্নে যে ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জগুলো থাকে, তা মোকাবিলায় মানুষের সবসময়ই সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, এই দায়িত্বগুলো সাধারণত যৌথ পরিবারের সদস্যরা কিংবা কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা পালন করতেন। থ্যানাটোলজিস্ট (মৃত্যুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ) কোল ইম্পেরি ভক্সকে বলেন, “আপনার গির্জায় হয়তো শোকাতুরদের সহায়তাকারী এমন একটি গোষ্ঠী থাকতে পারে, যারা মূলত মৃত্যুর আগের সময়টুকুতে, মৃত্যুর মুহূর্তে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা ও যত্ন নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে।”
কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক আমেরিকানই তাদের পরিবার থেকে দূরে বসবাস করেন এবং এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ কোনো ধর্মের সঙ্গেই যুক্ত নন। এ ছাড়া মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি এবং তাদের প্রিয়জনরা বিভিন্ন লজিস্টিক্যাল বাধার সম্মুখীন হন। ‘স্কুল অব আমেরিকান থ্যানাটোলজি’-র প্রতিষ্ঠাতা ইম্পেরি বলেন, “আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অসুস্থ রোগীদের যত্ন নেওয়ার জন্য তৈরি এবং ফিউনারেল হোমগুলো (মরদেহ সংরক্ষণাগার) মরদেহ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে; কিন্তু এই দুই অবস্থার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য খুব সামান্য ব্যবস্থাই রয়েছে।”
আর এখানেই প্রয়োজন পড়ে ‘ডেথ ডুলা’দের। ইম্পেরি জানান, এই পেশাদাররা মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে অসংখ্য উপায়ে সাহায্য করতে পারেন। তারা প্রিয়জনদের জন্য আলাদা করে রাখা জিনিসগুলোতে লেবেল লাগিয়ে ব্যক্তির শেষ কাজগুলো গুছিয়ে দিতে পারেন। তারা ডাক্তার নন, কিন্তু তারা প্রাথমিক শারীরিক যত্ন নিতে পারেন–যেমন আরাম দেওয়ার জন্য মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির মুখে পানি দিয়ে মুছে দেওয়া।
যেসব অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুবরণের আইনি অনুমতি রয়েছে, সেখানে কিছু ডুলা জীবনাবসানের ওষুধ সংগ্রহ এবং তা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটিতে মানুষকে পথপ্রদর্শক হিসেবে সাহায্য করেন। ডেথ ডুলারা ডাক্তার এবং অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের কাছে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পক্ষে কথা বলতে পারেন।
ম্যাডিসন বারাস, যিনি একজন ডেথ ডুলা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং এখন মানুষকে মৃত্যু নিয়ে সচেতন হতে সাহায্য করেন, তিনি ভক্সকে বলেন, “অনেক সময় মানুষ ডাক্তারদেরই পরিস্থিতির একমাত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্বাস করে বসে থাকেন; অথচ সেখানে আলোচনা, প্রশ্ন তোলা কিংবা কিছুটা সময় ও সুযোগ পাওয়ার যথেষ্ট অবকাশ থাকে।”
কারও মৃত্যুর পর একজন ডুলা মৃতদেহটিকে মর্গে বা ফিউনারেল হোমে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সহায়তা করতে পারেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। যদিও কিছু ডেথ ডুলা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন, তবে এই সেবার জন্য পরিবারগুলোকে প্রতি ঘণ্টায় ২৫ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হতে পারে এবং সাধারণত এটি বিমার আওতাভুক্ত নয়।
কেন আরও বেশি মানুষ ডেথ ডুলা হতে চাইছেন
আমাদের সংস্কৃতি যেখানে শারীরিক ক্ষয় বা বার্ধক্যের বাস্তবতা থেকে এখনও দূরে সরে থাকতে চায়, সেখানে ডেথ ডুলা-রা এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। বার্ধক্য, ভেঙে পড়া বা দুর্বলতার প্রতি এক ধরনের সাংস্কৃতিক অনীহা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিত্তশালী ব্যক্তিরা বার্ধক্যকে রুখে দেওয়ার প্রচেষ্টায় চরম সব পদক্ষেপ নিয়েছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক মানুষ ঠিক এর বিপরীত দিকে হাঁটছেন। তারা মৃত্যুকে আরও সহজভাবে গ্রহণ করার পথে এগোচ্ছেন। বারাস বলেন, “বিশেষ করে অতিমারি পুরো দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র) মৃত্যু এবং মৃত্যুপথযাত্রীদের সাথে এক নতুন ধরনের ঘনিষ্ঠতায় বাধ্য করেছে।”
বারাস আরও মনে করেন, এর সাথে যুক্ত হয়েছে আবেগ প্রকাশের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, যা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিমূলক পোস্টগুলোর মাধ্যমে আরও গতি পেয়েছে। তার ভাষায়, “জীবিত থাকার মানবিক দিকগুলো ভাগ করে নেওয়া এখন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য এবং উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা যত বাড়ছে–এবং এই প্রক্রিয়াটিকে আরও অর্থবহ ও একাকীত্বমুক্ত করার উপায় মানুষ যত খুঁজছে–ডেথ ডুলা প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহও ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আর্থার যখন ২০১৫ সালে ‘গোয়িং উইথ গ্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার ভাষায়, “আমি কী নিয়ে কথা বলছি, তা কেউই বুঝত না। কিন্তু এখন মানুষকে বলতে শুনি, ‘ওহ, আমার প্রতিবেশী তো একজন ডেথ ডুলা।’”
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে আর্থার জানিয়েছিলেন, বর্তমানে অনেক কোম্পানি তাদের কর্মী কল্যাণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ডেথ ডুলার সুবিধা দিচ্ছে।
অনেকেই কোনো প্রিয়জনকে হারানোর পর ডেথ ডুলা হওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। উদাহরণস্বরূপ, বারাস তার মৃত্যুপথযাত্রী দাদির সেবা করার পর এই প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন।
ইম্পেরি ভক্সকে বলেন, “একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পাশে থাকার পর আপনার ভেতরে প্রায়ই এক অদ্ভুত সুন্দর কৌতূহল জেগে ওঠে। একবার যদি সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, তখন আপনি আপনার জীবনে এই কাজের জন্য আরও বেশি সুযোগ বা জায়গা খুঁজতে চাইবেন।”
আবার অনেকে নিজের মৃত্যুর চিন্তাটি সহজভাবে গ্রহণের জন্য ডেথ ডুলা প্রশিক্ষণের দিকে ঝোঁকেন। চলচ্চিত্র পরিচালক ক্লোয়ি ঝাও ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে বলেছিলেন, “আমি সারা জীবন মৃত্যুকে ভীষণ ভয় পেয়েছি। যেহেতু আমি একে খুব ভয় পাই, তাই আমার সামনে মৃত্যুকে নিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না; নয়তো জীবনের দ্বিতীয়ার্ধ কাটানো খুব কঠিন হয়ে পড়ত।”
ঝাও একা নন; যারা ‘স্কুল অব আমেরিকান থ্যানাটোলজি’-তে যারা সার্টিফিকেট কোর্সে অংশ নেন, তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অন্তত আংশিকভাবে হলেও মৃত্যুর ভয় কাটানোর উদ্দেশ্যে এটি করেন বলে জানান ইম্পেরি।
ইম্পেরি আরও বলেন, মৃত্যু সম্পর্কে জানা আসলে “আমাদের শরীর সম্পর্কে জানারই আরেকটি মাধ্যম। আমাদের সৃষ্টিই হয়েছে জন্ম নেওয়ার জন্য এবং মারা যাওয়ার জন্য–আর এটি আমাদেরই একটি অংশ।”
এই চরম সত্যটি একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য যেমন সত্য, তেমনি কোটিপতি তারকাদের জন্যও ঠিক ততটাই প্রযোজ্য। আর্থার বলেন, “টাকা দিয়ে আপনি আপনার প্রিয়জনের মৃত্যু বা নিজের মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবেন না। অনাদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত কেউই এর হাত থেকে রেহাই পায়নি।”

যারা মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা দেন তারা বলছেন যে, সেলিব্রিটিরা এই কাজের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন দেখে তারা খুশি। আর্থার বলেন, “আমি কৃতজ্ঞ যে সম্মানীয় কোনো ব্যক্তি এই ভীষণ মানবিক কাজটির গুরুত্ব সবার সামনে তুলে ধরছেন, যা অর্থ বা ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে প্রতিটি মানুষকে প্রভাবিত করে।”
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই কাজটি সবসময়ই ছিল, হয়তো ভিন্ন কোনো নামে। তিনি বলেন, “এটি কোনো সাময়িক ঝোঁক বা ফ্যাশন নয়। এটি অতি প্রাচীন এবং ভবিষ্যতেও দীর্ঘকাল টিকে থাকবে–আমি এবং নিকোল কিডম্যান মারা যাওয়ার অনেক পরেও।”
ডেথ ডুলা কি এখন সময়ের দাবি?
ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো’র এন্ড-অফ-লাইফ কেয়ার (জীবনাবসানকালীন সেবা) বিষয়ক গবেষক এবং ‘এন্ড-অব-লাইফ ডুলা ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ম্যারিয়ান ক্রাওচিকের মতে, জীবনাবসানকালীন সেবার বিবর্তন এখন সময়ের দাবি। কারণ, মানুষের মৃত্যুর ধরন বদলে গেছে; এখন সংক্রামক ব্যাধিতে বা আকস্মিক দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে, বিপরীতে প্রাণঘাতী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরের পর বছর বেঁচে থাকার হার বেড়েছে।
ক্রাওচিক বিবিসিকে বলেন, “আজকাল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ অনেক বেশি স্বাধীনচেতা। লাইফস্টাইল থেকে শুরু করে সবকিছু নিজের মতো চায়, যার মধ্যে নিজের মৃত্যুর প্রক্রিয়াটিকেও নিজের মতো করে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা অন্তর্ভুক্ত।”
অনেকে মনে করেন মৃত্যু-সঙ্গীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আবার অন্যদের মতে এই সেবাটিকে মূল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আলাদাই রাখা দরকার।
এ ছাড়া এই কাজের পেছনে খরচের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং ‘অসহায় ও সংবেদনশীল’ মানুষের সুযোগ নেওয়ার মতো আশঙ্কা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে ক্রাওচিকের মতে, বাস্তবতা হলো, জীবনের শেষ সময়ে সঠিক সেবা পাওয়াটা এখন লটারির মতো ভাগ্যনির্ভর এবং ডুলা বা মৃত্যুসঙ্গীরা সেবার এই শূন্যতাগুলো পূরণ করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
এদিকে, প্যালিয়েটিভ কেয়ার (উপশমকারী সেবা) ও শোকগ্রস্তদের সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা ‘সু রাইডার’-এর প্রধান মেডিকেল ডিরেক্টর ড. পল পারকিন্স বিবিসিকে বলেন, “এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাটি রোগীদের জন্য বোঝা এবং মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন তারা কোনো বড় রোগ নির্ণয়ের পর মানসিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যান।”
পারকিন্স বিশ্বাস করেন যে, যারা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাদের যথাসম্ভব ‘সেরা মানের জীবন উপভোগ’ করতে সাহায্য করা উচিত। এর সাথে তিনি আরও যোগ করেন, “যাতে তারা সেইসব মানুষদের সাথে সময় কাটাতে পারেন, যারা তাদের আনন্দ দেয়।”

চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন দুনিয়ায় নিকোল কিডম্যানের আধিপত্য নতুন কিছু নয়। ‘নাইন পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স’ এবং ‘বেবিগার্ল’-এর মতো হিট কাজগুলো থেকে বছরে কোটি কোটি ডলার আয় করছেন তিনি। হলিউডের এই জনপ্রিয় তারকা বর্তমানে নতুন এক পেশায় নামতে চলেছেন। তবে তার নতুন এই কাজটি আগের মতো গ্ল্যামারাস নয়, অর্থপ্রাপ্তিও অনেক কম, কিন্তু সম্ভবত মানুষের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। রূপালি পর্দার জৌলুস ঝেড়ে ফেলে তিনি মুখোমুখি হচ্ছেন জীবনের সবচেয়ে অমোঘ বাস্তবতার সামনে। আর তা হলো মৃত্যু। সম্প্রতি নিকোল একজন ‘ডেথ ডুলা’ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
ডেথ ডুলাকে ‘ডেথ কম্প্যানিয়ন’ বা মৃত্যুসঙ্গীও বলা হয়। এই খাতের সাথে জড়িতরা বলছেন, খণ্ডিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির এই সময়ে যখন মানুষ শেষ জীবনে এসে সহায়হীন হয়ে পড়ে, তখন এই ধরনের ভূমিকা দিন দিন আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এক অনুষ্ঠানে কিডম্যান বলেন, “আমার মা যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিলেন, তিনি খুব একাকী বোধ করছিলেন। পরিবারের পক্ষে যতটুকু সেবা দেওয়া সম্ভব ছিল তারও একটা সীমা ছিল। আমার বোন এবং আমার অনেকগুলো সন্তান, আমাদের ক্যারিয়ার এবং কাজ–সব মিলিয়ে আমরা চেয়েছিলাম মায়ের দেখাশোনা করতে, কারণ বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই। তখনই আমার মনে হয়েছিল, ইশ! পৃথিবীতে যদি এমন কিছু মানুষ থাকত, যারা নিরপেক্ষভাবে পাশে বসে শুধু সান্ত্বনা আর সেবাটুকু দিতে পারত।”

ডেথ ডুলা-রা হলেন ঠিক তেমনই মানুষ, আর এই পেশার প্রতি আগ্রহী হওয়ার তালিকায় কিডম্যান একা নন। ‘হ্যামনেট’ খ্যাত পরিচালক ক্লোয়ি ঝাও মৃত্যুভয় কাটিয়ে উঠতে ডেথ ডুলা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এমনকি অতি সম্প্রতি ‘দ্য পিট’ সিরিজের একটি কাহিনিসূত্রেও ডেথ ডুলা হিসেবে একটি চরিত্রকে দেখা গেছে।
মৃত্যুপথযাত্রীদের নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মতে, জীবনের শেষ দিনগুলোতে অন্যদের পথপ্রদর্শক হওয়ার বিষয়ে তারকাদের এই আগ্রহ মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। এটি আসলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই অংশ, যার মাধ্যমে তারা মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে চাইছেন। মৃত্যু মানুষের অস্তিত্বের এক অনিবার্য সত্য, যা সমসাময়িক আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ডেথ ডুলা প্রশিক্ষণ সংস্থা ‘গোয়িং উইথ গ্রেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা আলুয়া আর্থার মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ভক্সকে বলেন, “এটি এমন এক বিষয়, যা নিয়ে আমাদের সবাইকে লড়তে হয়। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে চুপ ছিলাম।”
ডেথ ডুলা আসলে কী করেন
ইন্টারন্যাশনাল এন্ড-অব-লাইফ ডুলা অ্যাসোসিয়েশন (আইনিল্ডা)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, একজন ‘এন্ড-অব-লাইফ ডুলা’ (জীবনাবসানকালীন সহযাত্রী) হলেন এমন একজন সঙ্গী, যিনি মৃত্যু, শোক ও নশ্বরতার মুখোমুখি হওয়া কোনো ব্যক্তি, তার পরিবার এবং তাদের সেবা-যত্নকারীদের এই কঠিন সময়টি পার করতে ব্যক্তিগত ও সহানুভূতিশীল সমর্থন জোগান। মৃত্যুর প্রক্রিয়াজুড়ে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এই ডুলা রোগীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেন এবং তাকে মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয়, আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক সেবা প্রদান করেন।
শোকাচ্ছন্ন অবস্থা এবং প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা সামলে ওঠার পাশাপাশি, মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনের যত্নে যে ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জগুলো থাকে, তা মোকাবিলায় মানুষের সবসময়ই সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, এই দায়িত্বগুলো সাধারণত যৌথ পরিবারের সদস্যরা কিংবা কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা পালন করতেন। থ্যানাটোলজিস্ট (মৃত্যুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ) কোল ইম্পেরি ভক্সকে বলেন, “আপনার গির্জায় হয়তো শোকাতুরদের সহায়তাকারী এমন একটি গোষ্ঠী থাকতে পারে, যারা মূলত মৃত্যুর আগের সময়টুকুতে, মৃত্যুর মুহূর্তে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা ও যত্ন নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে।”
কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক আমেরিকানই তাদের পরিবার থেকে দূরে বসবাস করেন এবং এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ কোনো ধর্মের সঙ্গেই যুক্ত নন। এ ছাড়া মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি এবং তাদের প্রিয়জনরা বিভিন্ন লজিস্টিক্যাল বাধার সম্মুখীন হন। ‘স্কুল অব আমেরিকান থ্যানাটোলজি’-র প্রতিষ্ঠাতা ইম্পেরি বলেন, “আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অসুস্থ রোগীদের যত্ন নেওয়ার জন্য তৈরি এবং ফিউনারেল হোমগুলো (মরদেহ সংরক্ষণাগার) মরদেহ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে; কিন্তু এই দুই অবস্থার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য খুব সামান্য ব্যবস্থাই রয়েছে।”
আর এখানেই প্রয়োজন পড়ে ‘ডেথ ডুলা’দের। ইম্পেরি জানান, এই পেশাদাররা মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে অসংখ্য উপায়ে সাহায্য করতে পারেন। তারা প্রিয়জনদের জন্য আলাদা করে রাখা জিনিসগুলোতে লেবেল লাগিয়ে ব্যক্তির শেষ কাজগুলো গুছিয়ে দিতে পারেন। তারা ডাক্তার নন, কিন্তু তারা প্রাথমিক শারীরিক যত্ন নিতে পারেন–যেমন আরাম দেওয়ার জন্য মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির মুখে পানি দিয়ে মুছে দেওয়া।
যেসব অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুবরণের আইনি অনুমতি রয়েছে, সেখানে কিছু ডুলা জীবনাবসানের ওষুধ সংগ্রহ এবং তা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটিতে মানুষকে পথপ্রদর্শক হিসেবে সাহায্য করেন। ডেথ ডুলারা ডাক্তার এবং অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের কাছে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পক্ষে কথা বলতে পারেন।
ম্যাডিসন বারাস, যিনি একজন ডেথ ডুলা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং এখন মানুষকে মৃত্যু নিয়ে সচেতন হতে সাহায্য করেন, তিনি ভক্সকে বলেন, “অনেক সময় মানুষ ডাক্তারদেরই পরিস্থিতির একমাত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্বাস করে বসে থাকেন; অথচ সেখানে আলোচনা, প্রশ্ন তোলা কিংবা কিছুটা সময় ও সুযোগ পাওয়ার যথেষ্ট অবকাশ থাকে।”
কারও মৃত্যুর পর একজন ডুলা মৃতদেহটিকে মর্গে বা ফিউনারেল হোমে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সহায়তা করতে পারেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। যদিও কিছু ডেথ ডুলা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন, তবে এই সেবার জন্য পরিবারগুলোকে প্রতি ঘণ্টায় ২৫ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হতে পারে এবং সাধারণত এটি বিমার আওতাভুক্ত নয়।
কেন আরও বেশি মানুষ ডেথ ডুলা হতে চাইছেন
আমাদের সংস্কৃতি যেখানে শারীরিক ক্ষয় বা বার্ধক্যের বাস্তবতা থেকে এখনও দূরে সরে থাকতে চায়, সেখানে ডেথ ডুলা-রা এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। বার্ধক্য, ভেঙে পড়া বা দুর্বলতার প্রতি এক ধরনের সাংস্কৃতিক অনীহা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিত্তশালী ব্যক্তিরা বার্ধক্যকে রুখে দেওয়ার প্রচেষ্টায় চরম সব পদক্ষেপ নিয়েছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক মানুষ ঠিক এর বিপরীত দিকে হাঁটছেন। তারা মৃত্যুকে আরও সহজভাবে গ্রহণ করার পথে এগোচ্ছেন। বারাস বলেন, “বিশেষ করে অতিমারি পুরো দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র) মৃত্যু এবং মৃত্যুপথযাত্রীদের সাথে এক নতুন ধরনের ঘনিষ্ঠতায় বাধ্য করেছে।”
বারাস আরও মনে করেন, এর সাথে যুক্ত হয়েছে আবেগ প্রকাশের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, যা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিমূলক পোস্টগুলোর মাধ্যমে আরও গতি পেয়েছে। তার ভাষায়, “জীবিত থাকার মানবিক দিকগুলো ভাগ করে নেওয়া এখন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য এবং উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা যত বাড়ছে–এবং এই প্রক্রিয়াটিকে আরও অর্থবহ ও একাকীত্বমুক্ত করার উপায় মানুষ যত খুঁজছে–ডেথ ডুলা প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহও ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আর্থার যখন ২০১৫ সালে ‘গোয়িং উইথ গ্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার ভাষায়, “আমি কী নিয়ে কথা বলছি, তা কেউই বুঝত না। কিন্তু এখন মানুষকে বলতে শুনি, ‘ওহ, আমার প্রতিবেশী তো একজন ডেথ ডুলা।’”
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে আর্থার জানিয়েছিলেন, বর্তমানে অনেক কোম্পানি তাদের কর্মী কল্যাণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ডেথ ডুলার সুবিধা দিচ্ছে।
অনেকেই কোনো প্রিয়জনকে হারানোর পর ডেথ ডুলা হওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। উদাহরণস্বরূপ, বারাস তার মৃত্যুপথযাত্রী দাদির সেবা করার পর এই প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন।
ইম্পেরি ভক্সকে বলেন, “একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পাশে থাকার পর আপনার ভেতরে প্রায়ই এক অদ্ভুত সুন্দর কৌতূহল জেগে ওঠে। একবার যদি সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, তখন আপনি আপনার জীবনে এই কাজের জন্য আরও বেশি সুযোগ বা জায়গা খুঁজতে চাইবেন।”
আবার অনেকে নিজের মৃত্যুর চিন্তাটি সহজভাবে গ্রহণের জন্য ডেথ ডুলা প্রশিক্ষণের দিকে ঝোঁকেন। চলচ্চিত্র পরিচালক ক্লোয়ি ঝাও ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে বলেছিলেন, “আমি সারা জীবন মৃত্যুকে ভীষণ ভয় পেয়েছি। যেহেতু আমি একে খুব ভয় পাই, তাই আমার সামনে মৃত্যুকে নিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না; নয়তো জীবনের দ্বিতীয়ার্ধ কাটানো খুব কঠিন হয়ে পড়ত।”
ঝাও একা নন; যারা ‘স্কুল অব আমেরিকান থ্যানাটোলজি’-তে যারা সার্টিফিকেট কোর্সে অংশ নেন, তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অন্তত আংশিকভাবে হলেও মৃত্যুর ভয় কাটানোর উদ্দেশ্যে এটি করেন বলে জানান ইম্পেরি।
ইম্পেরি আরও বলেন, মৃত্যু সম্পর্কে জানা আসলে “আমাদের শরীর সম্পর্কে জানারই আরেকটি মাধ্যম। আমাদের সৃষ্টিই হয়েছে জন্ম নেওয়ার জন্য এবং মারা যাওয়ার জন্য–আর এটি আমাদেরই একটি অংশ।”
এই চরম সত্যটি একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য যেমন সত্য, তেমনি কোটিপতি তারকাদের জন্যও ঠিক ততটাই প্রযোজ্য। আর্থার বলেন, “টাকা দিয়ে আপনি আপনার প্রিয়জনের মৃত্যু বা নিজের মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবেন না। অনাদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত কেউই এর হাত থেকে রেহাই পায়নি।”

যারা মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা দেন তারা বলছেন যে, সেলিব্রিটিরা এই কাজের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন দেখে তারা খুশি। আর্থার বলেন, “আমি কৃতজ্ঞ যে সম্মানীয় কোনো ব্যক্তি এই ভীষণ মানবিক কাজটির গুরুত্ব সবার সামনে তুলে ধরছেন, যা অর্থ বা ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে প্রতিটি মানুষকে প্রভাবিত করে।”
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই কাজটি সবসময়ই ছিল, হয়তো ভিন্ন কোনো নামে। তিনি বলেন, “এটি কোনো সাময়িক ঝোঁক বা ফ্যাশন নয়। এটি অতি প্রাচীন এবং ভবিষ্যতেও দীর্ঘকাল টিকে থাকবে–আমি এবং নিকোল কিডম্যান মারা যাওয়ার অনেক পরেও।”
ডেথ ডুলা কি এখন সময়ের দাবি?
ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো’র এন্ড-অফ-লাইফ কেয়ার (জীবনাবসানকালীন সেবা) বিষয়ক গবেষক এবং ‘এন্ড-অব-লাইফ ডুলা ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ম্যারিয়ান ক্রাওচিকের মতে, জীবনাবসানকালীন সেবার বিবর্তন এখন সময়ের দাবি। কারণ, মানুষের মৃত্যুর ধরন বদলে গেছে; এখন সংক্রামক ব্যাধিতে বা আকস্মিক দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে, বিপরীতে প্রাণঘাতী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরের পর বছর বেঁচে থাকার হার বেড়েছে।
ক্রাওচিক বিবিসিকে বলেন, “আজকাল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ অনেক বেশি স্বাধীনচেতা। লাইফস্টাইল থেকে শুরু করে সবকিছু নিজের মতো চায়, যার মধ্যে নিজের মৃত্যুর প্রক্রিয়াটিকেও নিজের মতো করে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা অন্তর্ভুক্ত।”
অনেকে মনে করেন মৃত্যু-সঙ্গীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আবার অন্যদের মতে এই সেবাটিকে মূল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আলাদাই রাখা দরকার।
এ ছাড়া এই কাজের পেছনে খরচের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং ‘অসহায় ও সংবেদনশীল’ মানুষের সুযোগ নেওয়ার মতো আশঙ্কা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে ক্রাওচিকের মতে, বাস্তবতা হলো, জীবনের শেষ সময়ে সঠিক সেবা পাওয়াটা এখন লটারির মতো ভাগ্যনির্ভর এবং ডুলা বা মৃত্যুসঙ্গীরা সেবার এই শূন্যতাগুলো পূরণ করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
এদিকে, প্যালিয়েটিভ কেয়ার (উপশমকারী সেবা) ও শোকগ্রস্তদের সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা ‘সু রাইডার’-এর প্রধান মেডিকেল ডিরেক্টর ড. পল পারকিন্স বিবিসিকে বলেন, “এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাটি রোগীদের জন্য বোঝা এবং মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন তারা কোনো বড় রোগ নির্ণয়ের পর মানসিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যান।”
পারকিন্স বিশ্বাস করেন যে, যারা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাদের যথাসম্ভব ‘সেরা মানের জীবন উপভোগ’ করতে সাহায্য করা উচিত। এর সাথে তিনি আরও যোগ করেন, “যাতে তারা সেইসব মানুষদের সাথে সময় কাটাতে পারেন, যারা তাদের আনন্দ দেয়।”

এনভিডিয়ার এই পদক্ষেপটি জানিয়ে দেয় যে, চিপের ব্যবসা এখন কতটা প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে; যেখানে কোম্পানিগুলো নিজেদের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে। গত মার্চ মাসে ব্রিটিশ ডিজাইন প্রতিষ্ঠান আর্ম এআই ডেটা সেন্টারের জন্য নিজস্ব সিপিইউ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে।