দেশের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। সাঙ্গু, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াইসহ বেশ কয়েকটি প্রধান নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত ১১ জুলাই সন্ধ্যার মধ্যেই দেশের ৬টি জেলার ৫টি নদীর মোট ৭টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে।
এর মধ্যে বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর পানি সর্বোচ্চ রূপ নিয়ে বিপদসীমার ২ মিটারেরও বেশি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
নদীর পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম, ফেনী, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং উত্তরাঞ্চলের নদী অববাহিকার নিচু এলাকাগুলো নতুন করে বন্যার ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (আইএফআরসি) ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে গত ১৪ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চলমান বন্যা পরিস্থিতি এবং আক্রান্ত অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি দাতব্য সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
নিডস অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (এনএডব্লিউজি) হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১০টি জেলায় প্রায় ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৪ জন মানুষ বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার ৫০০ মানুষ সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতিমধ্যে ১ হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে, ৭টি জেলায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টিরও বেশি পরিবার বন্যার পানিতে অবরুদ্ধ হয়ে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
দেশজুড়ে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক সরকারি হিসাবে জানা গেছে, বান্দরবানে ১৫ হাজার ৮৮১টি এবং চট্টগ্রামে ১৩ হাজার ৮৬০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে পানি জমে থাকা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ১০টি জেলার ২৭টি উপজেলায় পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বহু এলাকায় নলকূপ ও টয়লেট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
মলমূত্র, কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্য মিশে পানির উৎসগুলো দূষিত হয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) জানায়, ১২ জুলাই পর্যন্ত ১২ হাজার ৩৬০টিরও বেশি ল্যাট্রিন এবং ৩ হাজার ৫৮৩টি পানির উৎস (নলকূপ) আংশিক বা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ।
ছবি: রয়টার্সকক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম সংকট
রেড ক্রিসেন্টের রিপোর্টে বলা হয়, কক্সবাজারের পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প—উভয় ক্ষেত্রেই বন্যার বড় প্রভাব পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ৩৩টি ক্যাম্পে ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ নানামুখী সংকটে পড়েছেন। সেখানে ৩ হাজার ১০০টিরও বেশি ঘর বা শেল্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৪ হাজার ৭০০-এরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
পাহাড়ধস ও বন্যার কারণে ক্যাম্পে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, পাহাড়ধস ও ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে এ পর্যন্ত ১৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
সরকারি উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে বহুমাত্রিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে।
জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ১ হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করার পাশাপাশি নগদ অর্থ, চাল, শিশুখাদ্য, নিরাপদ খাবার পানি এবং অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
আক্রান্ত ৫০টি উপজেলায় ইতিমধ্যে ৫১৬টি মেডিকেল টিম মোতায়েন করেছে সরকার। জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।
মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি ও চাহিদা নিরূপণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, পানি ও স্যানিটেশন, খাদ্য সহায়তা, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা, স্থানান্তর, প্রাথমিক চিকিৎসা, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ এবং মরদেহ ব্যবস্থাপনা ও শনাক্তকরণের বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
রেড ক্রিসেন্টের মানবিক সহায়তা
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ক্ষতিগ্রস্ত ৭টি জেলায় তাৎক্ষণিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৮ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে।
উদ্ধার কাজের জন্য রবার বোট, লাইফ জ্যাকেট, জেনারেটরসহ বিপুল পরিমাণ রেসকিউ সরঞ্জাম এবং ৫ হাজার৫০০টি জেরি ক্যান পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া বন্যাদুর্গত ২ হাজার২২০টি পরিবারকে চাল, ডাল, তেল, ওআরএস স্যালাইন ও স্যানিটারি প্যাডসহ শুকনো ও প্রয়োজনীয় খাবারের প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উদ্ধার কাজ ও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ৪৯৪টি পরিবারকে ঘর তৈরির জরুরি সামগ্রী দেওয়া হয়েছে।
সেখানে মেডিকেল টিম ও ওয়াশ ভলান্টিয়াররা কাজ করছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইএফআরসি-এর ডিআরইএফ ফান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
এছাড়া আমেরিকান ও সুইডিশ রেড ক্রস যৌথভাবে ৫০ হাজার ডলারের প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করেছে। আইএফআরসি পুরো ত্রাণ ও উদ্ধার কাজের আন্তর্জাতিক সমন্বয় করছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে রেড ক্রিসেন্ট ছাড়াও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিজিবিসহ অন্যান্য সংস্থাও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।