দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শীর্ষ নেতৃত্বে আবারও পরিবর্তন এসেছে। মাত্র ২২ মাসে তিনবার চেয়ারম্যান বদলের ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতে বিরল। এই পরিবর্তনকে কেউ দেখছেন দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রভাব থেকে ব্যাংকটিকে মুক্ত করার সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, আবার কেউ মনে করছেন এটি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।
নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলম দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার তার প্রথম কর্মদিবসের আগে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ ব্যানারে বিক্ষোভ হয়। আন্দোলনকারীরা তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই নিয়োগকে ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর মব জাস্টিসের মাধ্যমে তাকে (মো. খুরশীদ আলম) পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সে কারণেই তাকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।”
প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবল একটি চেয়ারম্যান পরিবর্তনের ঘটনা, নাকি দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন পর্বের সূচনা?
২২ মাসে তিন চেয়ারম্যান
প্রথম পরিবর্তন: ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার অংশ হিসেবে নতুন পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয়। সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করা হয়।
তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে এই পদক্ষেপকে ব্যাংক খাত সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছিল, ব্যাংকটির করপোরেট গভর্ন্যান্স পুনরুদ্ধার, ঋণ অনিয়ম তদন্ত এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তার ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায়। তিন দিন পর তিনি পদত্যাগ করেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্তিগত কারণের কথা বলা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে তদন্তের চাপও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
দ্বিতীয় পরিবর্তন: অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান
ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের পদত্যাগের পর ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমানকে চেয়ারম্যান করা হয়। তার নিয়োগকে তুলনামূলকভাবে পেশাদার ও প্রযুক্তিবিদ-নির্ভর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই অধ্যায়ও দীর্ঘ হয়নি।
তৃতীয় পরিবর্তন: মো. খুরশীদ আলম
২০২৬ সালের ২৪ মে অধ্যাপক জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে কোনো পক্ষ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি, তবে ব্যাংকটির নেতৃত্ব পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এস আলম অধ্যায়: দীর্ঘ ছায়ার প্রভাব
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে এর সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ দেশের প্রথম শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিনিয়োগকারী, ইসলামিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা ব্যাংকটি কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
২০১৭ সালে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। ওই সময় এস আলম গ্রুপের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যেখানে নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ১৩৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, এ অবনতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের দীর্ঘমেয়াদি ফল।
২০২৪-পরবর্তী পুনর্গঠন: কার হাতে নিয়ন্ত্রণ?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। ক্ষমতার পালাবদলের পর ব্যাংকটিকে ঘিরে নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-কোম্পানি আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এবং নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়। এস আলম-সংশ্লিষ্ট শেয়ার ও পরিচালনাগত প্রভাব সীমিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
ড. আহসান এইচ মনসুর তখন বলেছিলেন, “পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন প্রধান লক্ষ্য ঋণ আদায় ও সম্পদ পুনরুদ্ধার।” কিন্তু পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বে ধারাবাহিক পরিবর্তন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সমালোচকদের মতে, সরকার ও নীতিনির্ধারণী কাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটলে তা ব্যাংকটির প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
স্বার্থের মানচিত্র: কার অবস্থান কোথায়?
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ এক জায়গায় মিললেও সবক্ষেত্রে এক নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের বৃহত্তম ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সামাজিক নেটওয়ার্কের সম্পর্ক রয়েছে। জামায়াত-সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী মহলের অংশ দীর্ঘকাল ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত। এস আলম গ্রুপের সরে যাওয়ার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ কার কাছে যাবে, তা নিয়ে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো সক্রিয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এটি নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার পরীক্ষার ক্ষেত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইছে ব্যাংকটির সুশাসন ফিরিয়ে আনতে, তবে সেই প্রক্রিয়া কতটা রাজনৈতিক চাপমুক্ত—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও ব্যাংকটির গুরুত্ব কম নয়। একসময় ব্যাংকটির শেয়ার কাঠামোয় বিদেশি অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের অংশীদারিত্ব কমেছে, যা আস্থার সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে আমানতকারী ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের প্রধান উদ্বেগ হলো স্থিতিশীলতা। বোর্ডরুমের ধারাবাহিক পরিবর্তন ও নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ব্যাংকিং বিশ্লেষক ও সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ড. ইয়াসিন আলী বলেন, “বাংলাদেশে বড় ব্যাংকগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিফলন হয়ে ওঠে। ফলে চেয়ারম্যান নিয়োগকে শুধু করপোরেট সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না।”
ইয়াসিন আলীর মতে, “পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু একটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও জড়িত থাকে।”
অন্যদিকে, সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সময় ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন ও ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতাই ব্যাংক খাতের বহু সংকটের মূল কারণ।
করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই বছরের কম সময়ে তিন চেয়ারম্যান পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ইতিবাচক বার্তা দেয় না। এতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সামনে যে প্রশ্ন
ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা পুনরুদ্ধার। খেলাপি ঋণের চাপ, নেতৃত্বের অস্থিরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে ব্যাংকটি এখনও পুনরুদ্ধারের কঠিন পথ অতিক্রম করছে।
২২ মাসে তিন চেয়ারম্যান পরিবর্তনের ঘটনাকে একভাবে দেখলে এটি সংস্কারের অংশ। অন্যভাবে দেখলে এটি নিয়ন্ত্রণের নতুন লড়াইয়ের প্রতিফলন।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এস আলম-পরবর্তী সময়ে যারা নেতৃত্বে এসেছেন, তারা কি সত্যিই স্বাধীন সংস্কারক, নাকি ব্যাংকটিকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন?
দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর। কারণ ইসলামী ব্যাংকের গল্প এখন আর শুধু একটি ব্যাংকের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিরও গল্প।