ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার ঝুঁকি থাকলেও তিনি নিজের মাটিতে ফিরতে চান। তবে তার দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তিনি ফিরলে আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছে।
দেশেফেরানিয়েশেখহাসিনাকীবলেছেন?
প্রায় ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তবে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যার আশঙ্কাও রয়েছে। তারপরও তিনি দেশে ফিরতে চান। তিনি বলেন, তার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চলছে এবং মৃত্যু এলে নিজের মাটিতেই তিনি তা বরণ করতে চান।
দিল্লি থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। এ কারণে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানান, তার সঙ্গে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন।
শেখ হাসিনা জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে বা ফেরার সময় নিয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তিনি বলেন, “ঢাকার কর্তৃপক্ষ আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।’’
এর আগে গত ২৮ জুন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। তার ওই বক্তব্য ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ অনলাইন সভার পর দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলেছেন।
শেখহাসিনাকেকোনকোনমামলারমুখোমুখিহতেহবে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ কয়েক শ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছবি: রয়টার্স
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় সারা দেশে মোট ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৫৩টি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার হত্যাকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৬৬৩টি মামলায় আসামি হিসেবে নাম এসেছে শেখ হাসিনার।
মোট মামলার মধ্যে ৮৩৭টি হত্যা মামলা, যার ৪৫৩টিতে হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
আপিলেরসুযোগকিএখনওআছে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আইনে নির্ধারিত এই সময় পার হওয়ার পর বিলম্ব মার্জনা করে আপিল গ্রহণের বিষয়ে আলাদা কোনো বিধানও উল্লেখ নেই।
তবে এখানেই আইনি বিতর্কের জায়গা রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, বিদেশে অবস্থান, দেশে ফিরতে না পারা বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ দেখিয়ে বিলম্ব মার্জনার (Condonation of Delay) আবেদন করা যেতে পারে। আদালত যদি সেই আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিলের পথ খুলে যাবে এবং মামলার মূল বিষয়ে শুনানি হবে। কিন্তু আদালত যদি বিলম্ব মার্জনার আবেদন নাকচ করেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিলের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামি, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করেছেন। সেই আপিল বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন। তবে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশের বাইরে থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করেননি।
সব মিলিয়ে, দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন হবে, আদালত তার বিলম্ব মার্জনার আবেদন গ্রহণ করবেন কি না। কারণ, এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে তিনি রায়ের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ আপিল করার সুযোগ পাবেন কি না।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির আপিলের সুযোগ থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ। তিনি বলেছেন, বিশেষ আইনে বিলম্ব মার্জনার সুযোগ না থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের স্বার্থে উচ্চতর আদালতে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
ইমতিয়াজ মাহমুদ চরচাকে বলেন, “আগে ধারণা ছিল যে, বিশেষ আইন হওয়ায় ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিলম্ব মার্জনার সুযোগ সাধারণত থাকে না। তবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে একটি সর্বজনস্বীকৃত নীতি রয়েছে, যেখানে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তা কার্যকরের আগে উচ্চতর ফোরামে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা উচিত।”
ইমতিয়াজ মাহমুদ উদাহরণ দিয়ে বলেন, সাধারণ আইনে কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি আপিল না করলে হাইকোর্টে ‘ডেথ রেফারেন্স’ হিসেবে মামলাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুনানি হয়। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ডের রায় আরেকবার উচ্চতর আদালতে পর্যালোচনা করা হয়।
ইমতিয়াজ মাহমুদের মতে, বিশেষ আইনে বিলম্ব মার্জনার সুযোগ না থাকার বিষয়টি রয়েছে। অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়ার নীতিও রয়েছে। এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, “কোনো আদালত একই ধরনের ঘটনায় একবার যে সিদ্ধান্ত নেয়, পরে একই পরিস্থিতিতে অন্য কারও ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একই ধরনের মামলায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।”
এদিকে আপিলের সুযোগ থাকার একটি ইঙ্গিত মিলেছে গত ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দেওয়া বক্তব্যে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হবে। তিনি দেশি বা বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন এবং আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে খালাস, অন্য শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। সরকার তাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চায়।
দেশেফেরারপরকীহবে?
বর্তমান আইনি অবস্থায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং সেই রায়ের ভিত্তিতে সাজা পরোয়ানাও জারি রয়েছে। ফলে দেশে ফিরেই সরাসরি আদালতে আত্মসমর্পণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও আইনি প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, তাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পরই পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর তার আইনজীবীরা আদালতে প্রয়োজনীয় আবেদন করতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বিলম্ব মার্জনার আবেদন। আদালত যদি সেই আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিল বিভাগের সামনে মামলার শুনানির সুযোগ তৈরি হবে এবং ট্রাইব্যুনালের রায় চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবেন তিনি। আর আদালত যদি আবেদন গ্রহণ না করেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ই বহাল থাকবে এবং নিয়মিত আপিলের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটিই শেখ হাসিনার একমাত্র আইনি চ্যালেঞ্জ নয়। হত্যা, গুম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে অসংখ্য মামলা বিচারাধীন। দেশে ফিরলে এসব মামলাতেও তাকে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ফেরা মানেই কোনো মামলার তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি নয়। বরং এরপর শুরু হবে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া। সেখানে গ্রেপ্তার, আপিলের গ্রহণযোগ্যতা, পৃথক মামলার শুনানি এবং উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত–প্রতিটি ধাপই শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রচলিত আইনে আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই, তারা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। সীমান্তে প্রবেশ করলেই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ৬ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, “আইনগত অবশ্যই কোনো বাধা নেই। উনি (শেখ হাসিনা) ফিরবেন, ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন। আমাদের নরমাল সিআরপিসির যে প্রসিডিউর, সেটিই উনি ফলো করবেন।”
আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ মন্তব্য করেছেন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা সাজা থাকলে দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব । তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার আত্মসমর্পণের সুযোগ থাকবে না, এটি একজন ব্যক্তির আইনগত অধিকার। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলে আদালতে হাজির করা হবে। আর গ্রেপ্তার না হলে তিনি নিজেই আদালতের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারবেন।
ইমতিয়াজ বলেন, “কোনো ব্যক্তি যদি বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেন এবং ইমিগ্রেশনে নিজের পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট দেখান, তাহলে আইন অনুযায়ী পুলিশ তাকে সেখানেই গ্রেপ্তার করবে। তবে পুলিশ যদি তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি নিজেই আদালত বা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। তাই ‘আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই, শুধু গ্রেপ্তার করা হবে’–এমন আলোচনা অপ্রয়োজনীয়।
গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
১৬ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হবে। আপিলের সুযোগ থাকলে তা আইন অনুযায়ী হবে। সরকার শেখ হাসিনাকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরাতে চায়।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তব বাধা হতে পারে তার পাসপোর্ট। তিনি ভারত যাওয়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক (রেড) পাসপোর্ট ছিল। তবে পরে সরকার সেই পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে বর্তমানে তার কাছে কোনো বৈধ (ভ্যালিড) পাসপোর্ট নেই। এমন পরিস্থিতিতে তিনি কীভাবে দেশে ফিরতে পারবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, কোনো ব্যক্তির বৈধ পাসপোর্ট না থাকলেও তিনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে দেশে ফেরার জন্য নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। যদি তিনি বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক মিশনে গিয়ে জানান যে, তার আগের পাসপোর্ট কোনো কারণে আর কার্যকর নেই এবং তিনি দেশে ফিরতে চান, তাহলে নাগরিক হিসেবে নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে।
ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “সরকার যদি কোনো নাগরিককে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে কোনো নাগরিককে শুধু রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।”
লেখক তসলিমা নাসরিনের বিষয়টি এখানে প্রাসঙ্গিক। তসলিমা দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পরও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মিশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে তাকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়নের মতো কাজেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর বাইরে দাউদ হায়দারের নামও এখানে স্মরণযোগ্য।
এ বিষয়ে ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে তার মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কোনো নাগরিককে পাসপোর্ট বা কূটনৈতিক সেবা থেকে বঞ্চিত করা আইনসঙ্গত নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা অন্য কোনো কারণে নাগরিক অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।”
মৃত্যুদণ্ডকিসঙ্গেসঙ্গেইকার্যকরহবে?
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর করা যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ অনুসরণ করতে হয়।
প্রথমে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিলের সুযোগ পান। আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। তবে আইনজীবীদের একাংশের মতে, বিলম্বের যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আপিল গ্রহণের আবেদন করা যেতে পারে। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করলে আপিলের শুনানি হবে, আর আবেদন খারিজ হলে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকবে।
আপিল নিষ্পত্তির পরও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে। রিভিউ খারিজ হলে দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। সেই আবেদনও নাকচ হলে সংশ্লিষ্ট আদেশ কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর আইন অনুযায়ী ৭ থেকে ২১ দিনের মধ্যে যেকোনো সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, বিষয়টি এমন নয়। আপিল, রিভিউ এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মতো আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রশ্ন আসতে পারে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স
এ বিষয়ে আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকলেও দেশে ফিরলেই তাৎক্ষণিকভাবে সাজা কার্যকরের সুযোগ নেই। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরেই বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে সরাসরি ফাঁসি কার্যকর করা যাবে না। আইনে তার নিজের বক্তব্য উপস্থাপন এবং নির্ধারিত আইনি সুযোগ গ্রহণের অধিকার রয়েছে।”
তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন বা ‘মার্সি পিটিশন’ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন গ্রহণ করলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না। তাই আদালতের রায় থেকে সাজা কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আইনে নির্ধারিত পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
আইনজীবী ইমতিয়াজের মতে, কোনো ব্যক্তিকে আদালতের সিদ্ধান্ত ও আইনি সুযোগের বাইরে গিয়ে সরাসরি সাজা কার্যকর করা আইনসম্মত নয়।
শেখহাসিনারসামনেসবচেয়েবড়আইনিপ্রশ্নকী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও আদালত তার আপিল গ্রহণ করবেন কি না।
যদি আদালত বিলম্বের কারণ গ্রহণ করেন, তাহলে মামলার মূল বিষয়ে শুনানির সুযোগ তৈরি হবে। আর যদি তা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে।
সে কারণে দেশে ফেরা শেখ হাসিনার জন্য শুধু রাজনৈতিক নয়, বড় ধরনের একটি আইনি পরীক্ষাও। তার পরবর্তী অবস্থান নির্ধারণ করবে আদালতের সিদ্ধান্ত, বিদ্যমান আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া।
শেখ হাসিনা। ছবি: বাসস
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার ঝুঁকি থাকলেও তিনি নিজের মাটিতে ফিরতে চান। তবে তার দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তিনি ফিরলে আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছে।
দেশেফেরানিয়েশেখহাসিনাকীবলেছেন?
প্রায় ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তবে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যার আশঙ্কাও রয়েছে। তারপরও তিনি দেশে ফিরতে চান। তিনি বলেন, তার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চলছে এবং মৃত্যু এলে নিজের মাটিতেই তিনি তা বরণ করতে চান।
দিল্লি থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। এ কারণে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানান, তার সঙ্গে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন।
শেখ হাসিনা জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে বা ফেরার সময় নিয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তিনি বলেন, “ঢাকার কর্তৃপক্ষ আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।’’
এর আগে গত ২৮ জুন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। তার ওই বক্তব্য ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ অনলাইন সভার পর দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলেছেন।
শেখহাসিনাকেকোনকোনমামলারমুখোমুখিহতেহবে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ কয়েক শ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছবি: রয়টার্স
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় সারা দেশে মোট ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৫৩টি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার হত্যাকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৬৬৩টি মামলায় আসামি হিসেবে নাম এসেছে শেখ হাসিনার।
মোট মামলার মধ্যে ৮৩৭টি হত্যা মামলা, যার ৪৫৩টিতে হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
আপিলেরসুযোগকিএখনওআছে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আইনে নির্ধারিত এই সময় পার হওয়ার পর বিলম্ব মার্জনা করে আপিল গ্রহণের বিষয়ে আলাদা কোনো বিধানও উল্লেখ নেই।
তবে এখানেই আইনি বিতর্কের জায়গা রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, বিদেশে অবস্থান, দেশে ফিরতে না পারা বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ দেখিয়ে বিলম্ব মার্জনার (Condonation of Delay) আবেদন করা যেতে পারে। আদালত যদি সেই আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিলের পথ খুলে যাবে এবং মামলার মূল বিষয়ে শুনানি হবে। কিন্তু আদালত যদি বিলম্ব মার্জনার আবেদন নাকচ করেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিলের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামি, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করেছেন। সেই আপিল বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন। তবে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশের বাইরে থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করেননি।
সব মিলিয়ে, দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন হবে, আদালত তার বিলম্ব মার্জনার আবেদন গ্রহণ করবেন কি না। কারণ, এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে তিনি রায়ের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ আপিল করার সুযোগ পাবেন কি না।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির আপিলের সুযোগ থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ। তিনি বলেছেন, বিশেষ আইনে বিলম্ব মার্জনার সুযোগ না থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের স্বার্থে উচ্চতর আদালতে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
ইমতিয়াজ মাহমুদ চরচাকে বলেন, “আগে ধারণা ছিল যে, বিশেষ আইন হওয়ায় ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিলম্ব মার্জনার সুযোগ সাধারণত থাকে না। তবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে একটি সর্বজনস্বীকৃত নীতি রয়েছে, যেখানে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তা কার্যকরের আগে উচ্চতর ফোরামে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা উচিত।”
ইমতিয়াজ মাহমুদ উদাহরণ দিয়ে বলেন, সাধারণ আইনে কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি আপিল না করলে হাইকোর্টে ‘ডেথ রেফারেন্স’ হিসেবে মামলাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুনানি হয়। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ডের রায় আরেকবার উচ্চতর আদালতে পর্যালোচনা করা হয়।
ইমতিয়াজ মাহমুদের মতে, বিশেষ আইনে বিলম্ব মার্জনার সুযোগ না থাকার বিষয়টি রয়েছে। অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়ার নীতিও রয়েছে। এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, “কোনো আদালত একই ধরনের ঘটনায় একবার যে সিদ্ধান্ত নেয়, পরে একই পরিস্থিতিতে অন্য কারও ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একই ধরনের মামলায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।”
এদিকে আপিলের সুযোগ থাকার একটি ইঙ্গিত মিলেছে গত ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দেওয়া বক্তব্যে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হবে। তিনি দেশি বা বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন এবং আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে খালাস, অন্য শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। সরকার তাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চায়।
দেশেফেরারপরকীহবে?
বর্তমান আইনি অবস্থায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং সেই রায়ের ভিত্তিতে সাজা পরোয়ানাও জারি রয়েছে। ফলে দেশে ফিরেই সরাসরি আদালতে আত্মসমর্পণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও আইনি প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, তাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পরই পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর তার আইনজীবীরা আদালতে প্রয়োজনীয় আবেদন করতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বিলম্ব মার্জনার আবেদন। আদালত যদি সেই আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিল বিভাগের সামনে মামলার শুনানির সুযোগ তৈরি হবে এবং ট্রাইব্যুনালের রায় চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবেন তিনি। আর আদালত যদি আবেদন গ্রহণ না করেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ই বহাল থাকবে এবং নিয়মিত আপিলের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটিই শেখ হাসিনার একমাত্র আইনি চ্যালেঞ্জ নয়। হত্যা, গুম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে অসংখ্য মামলা বিচারাধীন। দেশে ফিরলে এসব মামলাতেও তাকে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ফেরা মানেই কোনো মামলার তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি নয়। বরং এরপর শুরু হবে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া। সেখানে গ্রেপ্তার, আপিলের গ্রহণযোগ্যতা, পৃথক মামলার শুনানি এবং উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত–প্রতিটি ধাপই শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রচলিত আইনে আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই, তারা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। সীমান্তে প্রবেশ করলেই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ৬ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, “আইনগত অবশ্যই কোনো বাধা নেই। উনি (শেখ হাসিনা) ফিরবেন, ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন। আমাদের নরমাল সিআরপিসির যে প্রসিডিউর, সেটিই উনি ফলো করবেন।”
আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ মন্তব্য করেছেন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা সাজা থাকলে দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব । তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার আত্মসমর্পণের সুযোগ থাকবে না, এটি একজন ব্যক্তির আইনগত অধিকার। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলে আদালতে হাজির করা হবে। আর গ্রেপ্তার না হলে তিনি নিজেই আদালতের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারবেন।
ইমতিয়াজ বলেন, “কোনো ব্যক্তি যদি বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেন এবং ইমিগ্রেশনে নিজের পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট দেখান, তাহলে আইন অনুযায়ী পুলিশ তাকে সেখানেই গ্রেপ্তার করবে। তবে পুলিশ যদি তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি নিজেই আদালত বা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। তাই ‘আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই, শুধু গ্রেপ্তার করা হবে’–এমন আলোচনা অপ্রয়োজনীয়।
গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
১৬ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হবে। আপিলের সুযোগ থাকলে তা আইন অনুযায়ী হবে। সরকার শেখ হাসিনাকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরাতে চায়।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তব বাধা হতে পারে তার পাসপোর্ট। তিনি ভারত যাওয়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক (রেড) পাসপোর্ট ছিল। তবে পরে সরকার সেই পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে বর্তমানে তার কাছে কোনো বৈধ (ভ্যালিড) পাসপোর্ট নেই। এমন পরিস্থিতিতে তিনি কীভাবে দেশে ফিরতে পারবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, কোনো ব্যক্তির বৈধ পাসপোর্ট না থাকলেও তিনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে দেশে ফেরার জন্য নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। যদি তিনি বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক মিশনে গিয়ে জানান যে, তার আগের পাসপোর্ট কোনো কারণে আর কার্যকর নেই এবং তিনি দেশে ফিরতে চান, তাহলে নাগরিক হিসেবে নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে।
ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “সরকার যদি কোনো নাগরিককে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে কোনো নাগরিককে শুধু রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।”
লেখক তসলিমা নাসরিনের বিষয়টি এখানে প্রাসঙ্গিক। তসলিমা দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পরও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মিশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে তাকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়নের মতো কাজেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর বাইরে দাউদ হায়দারের নামও এখানে স্মরণযোগ্য।
এ বিষয়ে ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে তার মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কোনো নাগরিককে পাসপোর্ট বা কূটনৈতিক সেবা থেকে বঞ্চিত করা আইনসঙ্গত নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা অন্য কোনো কারণে নাগরিক অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।”
মৃত্যুদণ্ডকিসঙ্গেসঙ্গেইকার্যকরহবে?
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর করা যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ অনুসরণ করতে হয়।
প্রথমে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিলের সুযোগ পান। আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। তবে আইনজীবীদের একাংশের মতে, বিলম্বের যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আপিল গ্রহণের আবেদন করা যেতে পারে। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করলে আপিলের শুনানি হবে, আর আবেদন খারিজ হলে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকবে।
আপিল নিষ্পত্তির পরও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে। রিভিউ খারিজ হলে দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। সেই আবেদনও নাকচ হলে সংশ্লিষ্ট আদেশ কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর আইন অনুযায়ী ৭ থেকে ২১ দিনের মধ্যে যেকোনো সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, বিষয়টি এমন নয়। আপিল, রিভিউ এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মতো আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রশ্ন আসতে পারে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স
এ বিষয়ে আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকলেও দেশে ফিরলেই তাৎক্ষণিকভাবে সাজা কার্যকরের সুযোগ নেই। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরেই বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে সরাসরি ফাঁসি কার্যকর করা যাবে না। আইনে তার নিজের বক্তব্য উপস্থাপন এবং নির্ধারিত আইনি সুযোগ গ্রহণের অধিকার রয়েছে।”
তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন বা ‘মার্সি পিটিশন’ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন গ্রহণ করলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না। তাই আদালতের রায় থেকে সাজা কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আইনে নির্ধারিত পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
আইনজীবী ইমতিয়াজের মতে, কোনো ব্যক্তিকে আদালতের সিদ্ধান্ত ও আইনি সুযোগের বাইরে গিয়ে সরাসরি সাজা কার্যকর করা আইনসম্মত নয়।
শেখহাসিনারসামনেসবচেয়েবড়আইনিপ্রশ্নকী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও আদালত তার আপিল গ্রহণ করবেন কি না।
যদি আদালত বিলম্বের কারণ গ্রহণ করেন, তাহলে মামলার মূল বিষয়ে শুনানির সুযোগ তৈরি হবে। আর যদি তা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে।
সে কারণে দেশে ফেরা শেখ হাসিনার জন্য শুধু রাজনৈতিক নয়, বড় ধরনের একটি আইনি পরীক্ষাও। তার পরবর্তী অবস্থান নির্ধারণ করবে আদালতের সিদ্ধান্ত, বিদ্যমান আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া।