Advertisement Banner

ব্যাংক খাত: ঋণে ডুবছে, সুরক্ষার টাকাও নেই

ব্যাংক খাত: ঋণে ডুবছে, সুরক্ষার টাকাও নেই
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

দেশের ব্যাংক খাতের সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। একদিকে খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ বিতরণে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। একই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায়।

পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির। তিনি বলেন, “প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ এবং ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আসলে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটা অভিশাপ।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ঋণের এই পাহাড় শুধু ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকেই দুর্বল করছে না, একই সঙ্গে অর্থনীতির বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যবসায়িক আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অধিকাংশ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা এসব ঋণ ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক প্রান্তিকেই শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকার বেশি।

মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার এখন ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৮ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে যেখানে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, এক বছর পর তা ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা

মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ।

ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শ্রেণিকৃত ঋণের প্রায় পুরোটাই এখন ‘মন্দঋণ’ শ্রেণিতে চলে গেছে। এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট শ্রেণিকৃত ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ।

অর্থাৎ, অধিকাংশ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা এসব ঋণ ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

বাড়ছে প্রকৃত ঝুঁকি

প্রভিশন ও স্থগিত সুদ সমন্বয়ের পর নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হারও বেড়েছে। মার্চ শেষে এ হার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশে, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

ব্যাংকারদের ভাষায়, এটি ইঙ্গিত দেয় যে কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও ব্যাংকগুলোর ঋণমানের অবনতি হচ্ছে। ফলে সামনের দিনে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

২ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি

ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর সংরক্ষিত অর্থের অবস্থাও উদ্বেগজনক।

মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকার প্রভিশন। কিন্তু সংরক্ষিত ছিল মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা।

ফলে পুরো ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। তিন মাস আগেও এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।

একই সময়ে প্রভিশন কভারেজ অনুপাত কমে ৫৫ দশমিক ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ৫৬ দশমিক ৬০ শতাংশ।

অর্থাৎ, ভবিষ্যতে ঋণখেলাপি থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার সক্ষমতাও দুর্বল হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

খেলাপি ঋণের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ৪৫ শতাংশেরও বেশি। এ ছাড়া এসব ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৭৪ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি মন্দঋণ বেসরকারি ব্যাংকে

খেলাপি ঋণের হার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় কম হলেও পরিমাণের বিচারে সবচেয়ে বেশি সমস্যাগ্রস্ত ঋণ রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে।

মার্চ শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।

তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, যা সব ব্যাংক শ্রেণির মধ্যে সর্বোচ্চ।

তুলনামূলক ভালো অবস্থায় বিদেশি ব্যাংক

দেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখনও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের মোট শ্রেণিকৃত ঋণের হার মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মতো ঘাটতিতে না থেকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশনে উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকা।

নতুন ঝুঁকির ইঙ্গিত

ব্যাংক খাতে ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের সম্ভাব্য সূচক হিসেবে পরিচিত ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টস’ (এসএমএ) দ্রুত বাড়ছে। মার্চ শেষে এসএমএর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসে প্রায় ২৮ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকার নতুন ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে গেছে।

সব মিলে মূল কথাটা হচ্ছে ব্যবসা আর বাংলাদেশে খুব বেশি প্রফিটেবল না। তো এটা কিন্তু খুবই একটা অশনি সংকেত অর্থনীতির জন্যে।

ব্যাংকাররা সাধারণত এসএমএ বৃদ্ধিকে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়ার আগাম সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করেন।

ঋণ প্রবৃদ্ধি কম, বাড়ছে উদ্বেগ

উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়লেও নতুন ঋণ বিতরণে গতি নেই।

মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

ড. মাহফুজ কবির চরচাকে বলেন, “সব মিলে মূল কথাটা হচ্ছে ব্যবসা আর বাংলাদেশে খুব বেশি প্রফিটেবল না। তো এটা কিন্তু খুবই একটা অশনি সংকেত অর্থনীতির জন্যে।”

তার মতে, ব্যবসা খাতে মুনাফা কমে গেলে উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ড. মাহফুজ বলেন, “বিজনেস যদি প্রফিটেবল না থাকে, সে ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাংকও চলতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোও মুখ থুবড়ে পড়বে।”

তার মতে, ব্যাংক খাত, ব্যবসা খাত এবং বীমা খাত একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব অন্য খাতেও পড়ে।

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের বর্তমান ভাইস চেয়ারপারসন ফারুক মঈনউদ্দীন। চরচাকে তিনি বলেন, “শুধু অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে এই খাতের সংকট দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।”

ফারুক মঈনউদ্দিন বলেন, “ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।”

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে এখন প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার শ্রেণিকৃত ঋণ, ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং ২ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ঋণ পুনরুদ্ধার জোরদার করা, করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী করা এবং নতুন ঋণের মান উন্নত করা ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ড. মাহফুজ কবির বলেন, “আমাদের আগামী বাজেটে একটা পরিষ্কার নির্দেশনা থাকতে হবে যে, আসলে এই ব্যাংকগুলোর ওপর থেকেও চাপ কমাতে হবে এবং একই সঙ্গে যে ব্যবসায়ীর ওপর থেকেও চাপ কমাতে হবে।”

তিনি বলেন, “ব্যাংক, ব্যবসা এবং সরকার–এই তিনটার যে একটা সম্পর্ক, সে সম্পর্কটা যেন আরো আস্থার জায়গায় চলে আসে। তো সেইভাবে আমাদেরকে নজর দিতে হবে বা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি না এলে আগামী প্রান্তিকগুলোতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পর্কিত