বিএনপির ‘বসন্ত’ যেন ফেব্রুয়ারিতেই

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
বিএনপির ‘বসন্ত’ যেন ফেব্রুয়ারিতেই
ছবি: চরচা

বিএনপির ‘বসন্ত’ কি তবে ফেব্রুয়ারি মাসেই? গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের এই মাসটি বিএনপির জন্য দারুণ পয়া। দলটি ফেব্রুয়ারিকে আলাদাভাবে উদ্‌যাপন করতেই পারে! তবে এটাও ঠিক, এই ফেব্রুয়ারি মাস রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য খানিকটা কলঙ্কেরও। ইতিহাস সেটাই বলছে।

১৯৭৮ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি কয়েক মাসের মধ্যেই সংসদে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাতে বিএনপি পেয়েছিল ২০৭ আসন।

জিয়া হত্যার পর এলোমেলা হয়ে পড়েছিল দলটি। সেটাই স্বাভাবিক। এমনিতেই বিভিন্ন দল–মতের রাজনীতিকেরা এসে জড়ো হয়েছিলেন বিএনপিতে। প্রতিষ্ঠাতার আকস্মিক মৃত্যুতে দলে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল। যদিও বিএনপির মনোনীত প্রার্থীই বিপুলভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতেছিলেন, তবুও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দলটির পিছু ছাড়েনি। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দলের হাল ধরেছিলেন জিয়াউর রহমানের সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াই এলোমেলো বিএনপিকে নিয়ে যান জনতার কাতারে। দলটিকে সত্যিকারের রাজনৈতিক চেহারা দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশে সামরিক শাসন জারি হলে বিএনপিই পড়ে গিয়েছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে, খালেদা জিয়া ৯ বছর ধরে রাজপথে থেকে বিএনপিকে ফেরান রাষ্ট্রক্ষমতায়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক দশক পর ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও প্রয়োজনীয় সমর্থন নিয়ে সরকার গড়তে অসুবিধা হয়নি বিএনপির। তবে বিএনপি আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এরপরই, আরও একটি ফেব্রুয়ারি মাসেই।

খালেদা জিয়ার সরকারের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ছিল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেটা বিএনপির কার্যকলাপের কারণেই। ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত সংসদের একটি আসনের উপনির্বাচনে সরকারি দল বিএনপির ব্যাপক কারচুপি রাজনৈতিক দলগুলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলতে এক প্রকার বাধ্যই করেছিল। সেই দাবিতে ব্যাপক আন্দোলনও হয়েছিল দেশে। কিন্তু বিএনপি সরকার সেই দাবি না মেনে পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের দিকে গিয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল একদলীয় ও অংশগ্রহণহীন। বিএনপির গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চরিত্রকে এলোমেলো করে দেওয়ার নির্বাচন ছিল সেটি। সে কারণেই বিএনপির রাজনীতির অন্যতম বড় কলঙ্ক সেই একদলীয় নির্বাচন। এক ফেব্রুয়ারি দিয়ে রাজকীয় যাত্রা, আরেক ফেব্রুয়ারি দিয়ে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন, কিন্তু অন্য একটা ফেব্রুয়ারি বিএনপিকে কলঙ্কিতই করেছিল। অথচ, ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচন এড়াতেই পারত বিএনপি।

বিএনপি সেই কলঙ্ক মুছেছে দ্রুতই। ১৫ ফেব্রুয়ারির সেই নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ দীর্ঘায়িত করেনি দলটি। মাত্র ১৩ দিনের মাথায় নিজেদের ২৭৮ জন সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সেই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। চার মাসের মাথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পরের নির্বাচনে বিএনপি হারলেও ১১৬ আসন নিয়ে দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বিরোধী দল হওয়াটাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না।

তারেক রহমান। ছবি: চরচা
তারেক রহমান। ছবি: চরচা

বিএনপি এরপরও ক্ষমতায় এসেছে, ২০০১ সালের নির্বাচন দিয়ে। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকেই বিপর্যয়ের শুরু তাদের। নিজেদের তৈরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রভাবিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিএনপি। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল দেশের নতুন রাজনৈতিক সংকট। সেনা–হস্তক্ষেপ, দেশে জরুরি অবস্থা জারি—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর, খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের জেল–জীবন, তারেক রহমানের বিদেশে নির্বাসন—বিএনপি নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ে পড়েছিল। এরপর ২০০৮ নবম সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়, দলটিকে ঠেলে দেয় খাদের কিনারায়। ২০০৮ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০–এর বেশি আসনে জিতে ক্ষমতায় আসে। প্রবল প্রতিপক্ষের ‘ব্রুট মেজরিটি’র আঁচে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পথেই ছিল বিএনপি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরের তিনটি নির্বাচনের জন্য ‘বন্দী’ করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ। দেশকে উপহার দিয়েছিল তিনটি বিতর্কিত ও কারচুপির নির্বাচন। বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আয়োজন করে যে কলঙ্কের ভাগিদার হয়েছিল, সেই কলঙ্ক থেকে তাদের মুক্তি দিয়েছে আওয়ামী লীগই। বিপর্যয়ের সময়টায় বিএনপি যেন আরও একটি প্রত্যাবর্তনের ফেব্রুয়ারিরই অপেক্ষায় ছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের পতন হয় ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে, এরপর থেকেই অপেক্ষা ছিল একটা নির্বাচনের। যে নির্বাচনে দেশের মানুষ বেছে নেবে তাদের প্রতিনিধি, বাধাহীনভাবে, উৎসব করেই। ১২ ফেব্রুয়ারি ছিল সেই উৎসবেরই। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বলেই যেন বিএনপি ছিল আশায় বুক বেঁধে। অবশেষে দেশের মানুষ বিএনপিকে উপহার দিয়েছে ‘ফেব্রুয়ারি–বসন্ত’। ২০৯ আসনে জিতে আরও একটি ফেব্রুয়ারিতেই হলো বিএনপির রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।

সম্পর্কিত