ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা। এর সূচনা হয়েছিল মূলত একটি ইন্টারনেট স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলনটি পরবর্তীতে অন্যতম বৃহৎ আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আন্দোলকারীরা শিক্ষায় দুর্নীতি, নিটের প্রশ্নফাঁস এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করে আসছিল। তবে তাদের মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের গত ১২ বছরের শাসনামলে যে কটি বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, তার মধ্যে সিজেপির আন্দোলন অন্যতম। অন্য প্রধান আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে ২০২০-২১ সালের কৃষি সংস্কার আইনবিরোধী কৃষক আন্দোলন এবং ২০১৯-২০ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ।
সিজেপির আন্দোলন শুরু করার পর একপর্যায়ে তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত ২৬ জুন থেকে যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন সমাজ ও অধিকারকর্মী এবং ম্যাগসেসে পুরস্কারজয়ী সোনম ওয়াংচুক। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিলেন তিনি। তার অনশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তারও অন্যতম দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। অনশনের ২১তম দিনে (১৮ জুলাই) তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে নাড্ডা ও জিতেন্দ্র তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর অনশন ভাঙেন তিনি।
এর আগে সিজেপির বিক্ষোভকারীরা ২০ জুলাই কেন্দ্রীয় সংসদের (লোকসভা) বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করে। এই সময় নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরে অবস্থান ধর্মঘট অব্যাহত রাখে। আন্দোলন ক্রমশ জোরালো ও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ২৩ জুলাই যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সরকারে প্রতি এক চরম হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, “প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে ২২ জন শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে গেছে। মোদিজী, আমি আবারও অনুরোধ করছি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করুন। তা না হলে এই আন্দোলন কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আন্দোলনের পরবর্তী তীর আপনার পদত্যাগের দিকেই ধাবিত হবে।”
অভিজিৎ দিপকের এই চরম হুঁশিয়ারি ও সোনম ওয়াংচুকের অনশন ভঙ্গের দুই দিনের মাথায় এবং সিজেপি ও কেন্দ্রের মধ্যে তৃতীয় দফার আলোচনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র পাঠান।
২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার ১২ বছরের ইতিহাসে এটি কোনো মন্ত্রীর মধ্যবর্তী সময়ে পদত্যাগের দ্বিতীয় ঘটনা।
২০১১ সালের ভারতে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১২ সালের যৌন সহিংসতাবিরোধী প্রচারণায় বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। এইসব আন্দোলন তখন সরকারকে তেমন সংকটে ফেলেনি। সে তুলনায় সিজেপির আন্দোলনে প্রথম দিকে অংশগ্রহণকারী সংখ্যা কমই ছিল। আন্দোলনটি ছিল খুবই সুনির্দিষ্ট ও কিছু সীমিত বিষয় নিয়ে।
অনেকের ধারণা, এ কারণেই মোদী সরকার তথা বিজেপি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না করার ব্যাপারে প্রথম থেকে অনড় অবস্থানে ছিল। এছাড়া, বিজেপির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর আগে তিনি মোদির মন্ত্রিসভায় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী, ইস্পাতমন্ত্রী এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধান ২০০০ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে উড়িষ্যা বিধানসভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হয়ে মূলধারার সংসদীয় রাজনীতিতে পা রাখেন। ২০০৪ সালে দেবগড় আসন থেকে তিনি প্রথমবারের মতো লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরই তিনি বিজেপির যুব সংগঠন ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার (বিজেওয়াইএম) সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব পান।
বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড ও কর্ণাটকের মতো রাজনৈতিকভাবে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বিজেপির বিধানসভা নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করে বেশ সাফল্য এনে দেন তিনি। বিশেষ করে ওডিশা ও ভারতের পূর্বাঞ্চলে। ২০২৪ সালে ওডিশা রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ ও সরকার গঠনের নেপথ্যের প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি। এরপর বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
ওডিশার রাজনীতি তথা জাতীয় রাজনীতিতেও তাকে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে দেখা হতো। তাকে পদচ্যুত করলে ওডিশাসহ জাতীয় পর্যায়ে দলীয় সংগঠন ও ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত আসবে বলে মনে করতেন বিজেপির অনেকে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত ছিলেন ছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। কেউ কেউ তাকে বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদির উত্তরসূরিও ভাবতেন।
ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মানেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরাজয় মনে করতেন অনেকে। যা প্রতীকী অর্থে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগেরই শামিল। এ জন্যই হয়তো তার পদত্যাগে এত দেরি হলো।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে তরুণদের পক্ষ থেকে এটিই তার সরকারের বিরুদ্ধে বড় এক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিরোধী দলগুলোও আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২০ জুলাই শুরু হওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন বারবার অচল করেছে। মোদির তৃতীয় মেয়াদে এটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আলোচনা সফল হয়ে বিক্ষোভ শান্ত হলেও অসন্তুষ্ট তরুণদের মধ্যে থাকা মূল ক্ষোভ ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা এসিএলইডির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া বলেন, “এটি এমন একটি ইস্যু, যা সবাইকে প্রভাবিত করে... সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর যেকোনো দমন-পীড়ন কেবল ক্ষোভ আরও বাড়াবে।”
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।