সিভিকাস লেন্সের বিশ্লেষণ
চরচা ডেস্ক

প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক। তবে নির্বাচনের এই ফলাফল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চেয়ে বরং একটি বংশানুক্রমিক দ্বিদলীয় ব্যবস্থার পুনর্বহালকেই ইঙ্গিত করে। এটি সেই সব তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, যাদের আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালে একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছিল।
তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মাত্র ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং সাবেক ক্ষমতাসীন দলকে বিতর্কিত আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে, তারা এবার আগের চেয়ে ভিন্নভাবে দেশ পরিচালনায় প্রস্তুত।
বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরিবেশ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারির কারচুপির নির্বাচনের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা একে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যেখানে দেশের মানুষ ক্ষমতা হস্তান্তর দেখেনি, সেখানে এই নির্বাচন ছিল এক প্রকৃত অগ্রগতি। তবে বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
একটি গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান
২০২৪ সালের নির্বাচন আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু এর মাত্র কয়েক মাস পরেই জেন-জি নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল যখন বাংলাদেশের হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করে। অন্যান্য কোটাসহ সব মিলিয়ে সরকারি খাতের অর্ধেকেরও কম চাকরি মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য অবশিষ্ট ছিল। ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগের বিশেষ সুবিধাভোগী তৈরির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত এই ব্যবস্থাটি তীব্র বেকারত্বে ভুগতে থাকা তরুণদের মাঝে গভীর হতাশার জন্ম দেয়।
২০২৪ সালের জুন মাস থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে এই বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে এবং সড়ক ও রেলপথ অবরোধের মাধ্যমে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া এই নীতিগত বিতর্ককে একটি রাজনৈতিক সংকটে রূপান্তর করে। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের ওপর সুপরিকল্পিত হামলা চালায়। কর্তৃপক্ষ দেখামাত্র গুলির (শুট-অন-সাইট) নির্দেশসহ দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। নিরাপত্তা বাহিনী জনসভার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালায়। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, এই দমন-পীড়নে অন্তত ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

সরকারের এই নৃশংসতা উল্টো ফল বয়ে আনে। আন্দোলনকারীরা প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ করতে তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট সেবা আংশিক সচল হওয়ার পর সেই ফুটেজগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্দোলনকারীদের ‘সহিংস আন্দোলনকারী’ হিসেবে তুলে ধরার সরকারি বয়ানকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে। শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য— যেখানে তাকে দুই হাত প্রসারিত করে নিরস্ত্র অবস্থায় পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবং এরপরই পুলিশ গুলি চালায়—সেই মুহূর্তটি এই গণঅভ্যুত্থানের এক অবিস্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়।
কোটা পদ্ধতির বিরোধিতা হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট যখন জনতা তার সরকারি বাসভবন অভিমুখে গণপদযাত্রা শুরু করে, তখন তিনি পদত্যাগ করেন এবং সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।
বাংলাদেশের এই জেন-জি বিপ্লব পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, নেপাল এবং আরও অনেক দেশের গণঅভ্যুত্থানকে অনুপ্রাণিত করতে সাহায্য করেছে।
নির্বাচনের পথে যাত্রা
হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর বাংলাদেশে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তার এই নিয়োগ ছিল ছাত্র আন্দোলনের একটি বিজয়। কারণ আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তারা কোনো সামরিক সমর্থিত প্রশাসন মেনে নেবেন না।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ইউনূসকে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। ক্ষমতায় এসে তিনি তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করা, রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা।
হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার করতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি অভ্যন্তরীণ বিচার বিভাগীয় সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ পুনর্গঠন করে। এছাড়া সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমনের মতো বিষয়গুলো সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়। সরকার এসব কমিশনের সুপারিশগুলো সংকলন করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে একটি অভিন্ন সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে আলোচনার জন্য ‘জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন’ গঠন করে।

২০২৫ সালের ৫ আগস্ট, হাসিনা পদত্যাগের প্রথম বার্ষিকীতে ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণা’ নাম দিয়ে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ইশতেহার ঘোষণা করেন। এটি গণঅভ্যুত্থানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, নিহতদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে এবং গণতান্ত্রিক নবায়নের মূলনীতিগুলো নির্ধারণ করে। এই ঘোষণাটি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কী ঘটেছিল এবং কেন ঘটেছিল তার একটি দাপ্তরিক ভাষ্য বা বয়ান প্রতিষ্ঠা করেছে। যা শুধুমাত্র একটি স্মৃতিচারণই নয় বরং রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়ার একটি বিশেষ পদক্ষেপও বটে।
তবে এটি বিতর্কিতও ছিল। ঘোষণাপত্রে দীর্ঘদিনের বিরোধী দল বিএনপি বা ডানপন্থী ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর কোনো ঐতিহাসিক ভুলত্রুটির উল্লেখ এড়িয়ে গিয়ে সমস্ত দায়ভার আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হয়েছিল।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ মাসব্যাপী আলোচনার ফসল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ একটি অত্যন্ত বিস্তারিত সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরে। এই সনদে ৮৪টি প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ করা হয়, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো, সংসদে বিরোধী দলের তদারকি ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং এমন এক কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকারই হাসিনার মতো রাষ্ট্রযন্ত্রকে কবজা করতে না পারে। অক্টোবর মাসে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্র ছিল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালের মে মাসে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে বাদ পড়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে আসে বছরের পর বছর দমন-পীড়ন ও নির্বাচন বর্জন করে আসা বিএনপি এবং পুনরুত্থিত জামায়াতে ইসলামী, যাদের ওপর ২০১৩ সাল থেকে থাকা নিষেধাজ্ঞা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তুলে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, দেশের অন্যতম বৃহত্তম একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হলে লাখ লাখ সমর্থকের ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে নির্বাচন যতই অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক হোক না কেন, এর বৈধতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।

নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কয়েক মাস ধরে ড. ইউনূস কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো এড়িয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ২০২৬ সালের জুনে নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও, ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তারিখটি প্রথমে এপ্রিলে এবং সবশেষে ফেব্রুয়ারিতে এগিয়ে আনতে বাধ্য হন। নির্বাচনে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান কাজে লাগাতে উন্মুখ বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের জন্য ব্যাপক চাপ দেয়। অন্যদিকে, জেন-জি আন্দোলনকারীদের দ্বারা নবগঠিত এনসিপি চেয়েছিল সংগঠনের কাজ গোছাতে এবং কোনো ভোট হওয়ার আগে সংস্কারগুলো নিশ্চিত করতে আরও সময় নিতে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কারের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গণভোটের তারিখ নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। বিএনপি চেয়েছিল নির্বাচন এবং গণভোট একই সাথে অনুষ্ঠিত হোক; অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি দাবি করেছিল যে, নতুন সংসদ দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো পাকাপোক্ত করতে প্রথমে গণভোট আয়োজন করা হোক। শেষ পর্যন্ত বিএনপির দাবিই জয়ী হয়।
বংশানুক্রমিক রাজনীতির প্রত্যাবর্তন
বিএনপি ও তার মিত্ররা ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী প্রায় ৮০টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা দলটির ইতিহাসে এযাবৎকালের সেরা ফলাফল। বিপরীতে, জেন-জি আন্দোলনকারীদের দল এনসিপি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে জয়ী হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মোট ৩৫০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় এবং বাকি ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত, যা দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। এবার একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিএনপির এই বিজয় ছিল ভাগ্যের এক নাটকীয় পরিবর্তন। দলটির নেতা তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তার মা দুইবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রামের অবিসংবাদিত প্রতীক ছিলেন। ছেলে ফেরার কয়েক দিন পরই খালেদা জিয়া মারা যান। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

ব্যক্তিগত বা পারিবারিক রেষারেষির ঊর্ধ্বে বাস্তব সত্য হলো এই যে, বাংলাদেশ আবারও সেই দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের একটির হাতে পরিচালিত হচ্ছে, যাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতিকে একটি রূপ দিয়েছে। বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল, এরপর হাসিনার কাছে পরাজিত হয়। এখন তারা সেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই ক্ষমতায় ফিরেছে, যা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এই নির্বাচনের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।
অনেক আন্দোলনকারী ঠিক এটাই চেয়েছিলেন- হাসিনার বিদায় এবং অবাধ নির্বাচনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু অনেকের প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। তারা আশা করেছিলেন এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং দেশ পরিচালনায় নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসবে। বাস্তবে তা ঘটেনি।
জেন-জি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি নির্বাচনে তরুণ নেতৃত্বাধীন এনসিপি খুব সামান্যই প্রভাব ফেলতে পেরেছে। তাদের এই শোচনীয় ফলাফল মূলত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কৌশলগত ভুলেরই প্রতিফলন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত এই দলটির হাতে একটি সংগঠন দাঁড় করানোর জন্য এক বছরেরও কম সময় ছিল; সঙ্গে ছিল সীমিত তহবিল এবং শহরকেন্দ্রিক গণ্ডির বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্কের অভাব।
তবে ডিসেম্বর মাসে তারা এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয় যা তাদের ব্যাপক জনসমর্থনের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সক্ষমতা পাওয়ার বিনিময়ে তারা ১১-দলীয় জোটের অংশ হিসেবে মাত্র ৩০টি আসনে লড়তে রাজি হয়। অনেক তরুণ ভোটার, যারা প্রকৃত অর্থে একটি নতুন রাজনীতির আশা করেছিলেন, তারা এই জোটকে পুরোনো ব্যবস্থার কাছে নতিস্বীকার হিসেবে গণ্য করেন। এই সিদ্ধান্ত দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকেও স্পষ্ট করে দেয়: এনসিপির বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান।
২৭ বছর বয়সী এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম একটি আসনে জয়ী হয়েছেন এবং সংসদের অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্যে পরিণত হয়েছেন। দলটি জানিয়েছে যে, তারা এক বছর পর হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী শিবিরে থেকে নিজেদের পুনর্গঠিত করবে। তবে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সীমিত। যে প্রজন্ম এই বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তারা যদি নিজেদের প্রান্তিক অবস্থানে আবিষ্কার করবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে দেয়, তবে তারা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হতে পারে।
একটি অনিশ্চিত পথ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, এই নির্বাচন ছিল একটি প্রকৃত সাফল্য। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৬০ শতাংশ, কারচুপি-ভরা ২০২৪ সালের নির্বাচনে ছিল মাত্র ৪২ শতাংশ। গণভোটে ৬০ শতাংশেরও বেশি ভোটার জুলাই সনদের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন, যা এই সংস্কার কর্মসূচিকে এমন এক গণতান্ত্রিক বৈধতা দিয়েছে যা নতুন সরকারের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।
তবে সব দলকে অবাধে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি হতে পারত। এছাড়া এটি পুরোপুরি সহিংসতামুক্তও ছিল না। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিএনপির সদস্য।
আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার এমন এক রাষ্ট্রযন্ত্রের উত্তরাধিকার হয়েছে, যা কয়েক দশকের একদলীয় আধিপত্যের কারণে চরমভাবে রাজনীতিকীকরণ হয়েছে। পুরনো স্বৈরাচারী অভ্যাস সহজে দূর হয় না। অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিএনপিকে সুশীল সমাজ ও বিরোধী দলগুলোর সাথে প্রকৃত আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো দমন-পীড়ন থেকে বিরত থাকতে হবে।
বর্তমান সরকারের প্রতি প্রস্তাব
সিভিকাস লেন্সের বিশ্লেষণটি ইংরেজি থেকে অনূদিত। সিভিকাস লেন্স দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ-ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। সিভিকাস লেন্স নাগরিক সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে সমসাময়িক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ তুলে ধরে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো-জনগণের আন্দোলনগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া ও নতুন পথ দেখাচ্ছে এবং বিজয় আনছে, তা তুলে ধরা।

প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক। তবে নির্বাচনের এই ফলাফল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চেয়ে বরং একটি বংশানুক্রমিক দ্বিদলীয় ব্যবস্থার পুনর্বহালকেই ইঙ্গিত করে। এটি সেই সব তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, যাদের আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালে একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছিল।
তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মাত্র ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং সাবেক ক্ষমতাসীন দলকে বিতর্কিত আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে, তারা এবার আগের চেয়ে ভিন্নভাবে দেশ পরিচালনায় প্রস্তুত।
বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরিবেশ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারির কারচুপির নির্বাচনের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা একে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যেখানে দেশের মানুষ ক্ষমতা হস্তান্তর দেখেনি, সেখানে এই নির্বাচন ছিল এক প্রকৃত অগ্রগতি। তবে বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
একটি গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান
২০২৪ সালের নির্বাচন আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু এর মাত্র কয়েক মাস পরেই জেন-জি নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল যখন বাংলাদেশের হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করে। অন্যান্য কোটাসহ সব মিলিয়ে সরকারি খাতের অর্ধেকেরও কম চাকরি মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য অবশিষ্ট ছিল। ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগের বিশেষ সুবিধাভোগী তৈরির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত এই ব্যবস্থাটি তীব্র বেকারত্বে ভুগতে থাকা তরুণদের মাঝে গভীর হতাশার জন্ম দেয়।
২০২৪ সালের জুন মাস থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে এই বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে এবং সড়ক ও রেলপথ অবরোধের মাধ্যমে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া এই নীতিগত বিতর্ককে একটি রাজনৈতিক সংকটে রূপান্তর করে। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের ওপর সুপরিকল্পিত হামলা চালায়। কর্তৃপক্ষ দেখামাত্র গুলির (শুট-অন-সাইট) নির্দেশসহ দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। নিরাপত্তা বাহিনী জনসভার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালায়। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, এই দমন-পীড়নে অন্তত ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

সরকারের এই নৃশংসতা উল্টো ফল বয়ে আনে। আন্দোলনকারীরা প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ করতে তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট সেবা আংশিক সচল হওয়ার পর সেই ফুটেজগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্দোলনকারীদের ‘সহিংস আন্দোলনকারী’ হিসেবে তুলে ধরার সরকারি বয়ানকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে। শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য— যেখানে তাকে দুই হাত প্রসারিত করে নিরস্ত্র অবস্থায় পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবং এরপরই পুলিশ গুলি চালায়—সেই মুহূর্তটি এই গণঅভ্যুত্থানের এক অবিস্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়।
কোটা পদ্ধতির বিরোধিতা হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট যখন জনতা তার সরকারি বাসভবন অভিমুখে গণপদযাত্রা শুরু করে, তখন তিনি পদত্যাগ করেন এবং সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।
বাংলাদেশের এই জেন-জি বিপ্লব পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, নেপাল এবং আরও অনেক দেশের গণঅভ্যুত্থানকে অনুপ্রাণিত করতে সাহায্য করেছে।
নির্বাচনের পথে যাত্রা
হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর বাংলাদেশে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তার এই নিয়োগ ছিল ছাত্র আন্দোলনের একটি বিজয়। কারণ আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তারা কোনো সামরিক সমর্থিত প্রশাসন মেনে নেবেন না।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ইউনূসকে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। ক্ষমতায় এসে তিনি তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করা, রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা।
হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার করতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি অভ্যন্তরীণ বিচার বিভাগীয় সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ পুনর্গঠন করে। এছাড়া সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমনের মতো বিষয়গুলো সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়। সরকার এসব কমিশনের সুপারিশগুলো সংকলন করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে একটি অভিন্ন সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে আলোচনার জন্য ‘জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন’ গঠন করে।

২০২৫ সালের ৫ আগস্ট, হাসিনা পদত্যাগের প্রথম বার্ষিকীতে ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণা’ নাম দিয়ে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ইশতেহার ঘোষণা করেন। এটি গণঅভ্যুত্থানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, নিহতদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে এবং গণতান্ত্রিক নবায়নের মূলনীতিগুলো নির্ধারণ করে। এই ঘোষণাটি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কী ঘটেছিল এবং কেন ঘটেছিল তার একটি দাপ্তরিক ভাষ্য বা বয়ান প্রতিষ্ঠা করেছে। যা শুধুমাত্র একটি স্মৃতিচারণই নয় বরং রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়ার একটি বিশেষ পদক্ষেপও বটে।
তবে এটি বিতর্কিতও ছিল। ঘোষণাপত্রে দীর্ঘদিনের বিরোধী দল বিএনপি বা ডানপন্থী ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর কোনো ঐতিহাসিক ভুলত্রুটির উল্লেখ এড়িয়ে গিয়ে সমস্ত দায়ভার আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হয়েছিল।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ মাসব্যাপী আলোচনার ফসল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ একটি অত্যন্ত বিস্তারিত সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরে। এই সনদে ৮৪টি প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ করা হয়, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো, সংসদে বিরোধী দলের তদারকি ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং এমন এক কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকারই হাসিনার মতো রাষ্ট্রযন্ত্রকে কবজা করতে না পারে। অক্টোবর মাসে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্র ছিল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালের মে মাসে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে বাদ পড়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে আসে বছরের পর বছর দমন-পীড়ন ও নির্বাচন বর্জন করে আসা বিএনপি এবং পুনরুত্থিত জামায়াতে ইসলামী, যাদের ওপর ২০১৩ সাল থেকে থাকা নিষেধাজ্ঞা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তুলে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, দেশের অন্যতম বৃহত্তম একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হলে লাখ লাখ সমর্থকের ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে নির্বাচন যতই অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক হোক না কেন, এর বৈধতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।

নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কয়েক মাস ধরে ড. ইউনূস কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো এড়িয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ২০২৬ সালের জুনে নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও, ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তারিখটি প্রথমে এপ্রিলে এবং সবশেষে ফেব্রুয়ারিতে এগিয়ে আনতে বাধ্য হন। নির্বাচনে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান কাজে লাগাতে উন্মুখ বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের জন্য ব্যাপক চাপ দেয়। অন্যদিকে, জেন-জি আন্দোলনকারীদের দ্বারা নবগঠিত এনসিপি চেয়েছিল সংগঠনের কাজ গোছাতে এবং কোনো ভোট হওয়ার আগে সংস্কারগুলো নিশ্চিত করতে আরও সময় নিতে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কারের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গণভোটের তারিখ নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। বিএনপি চেয়েছিল নির্বাচন এবং গণভোট একই সাথে অনুষ্ঠিত হোক; অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি দাবি করেছিল যে, নতুন সংসদ দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো পাকাপোক্ত করতে প্রথমে গণভোট আয়োজন করা হোক। শেষ পর্যন্ত বিএনপির দাবিই জয়ী হয়।
বংশানুক্রমিক রাজনীতির প্রত্যাবর্তন
বিএনপি ও তার মিত্ররা ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী প্রায় ৮০টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা দলটির ইতিহাসে এযাবৎকালের সেরা ফলাফল। বিপরীতে, জেন-জি আন্দোলনকারীদের দল এনসিপি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে জয়ী হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মোট ৩৫০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় এবং বাকি ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত, যা দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। এবার একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিএনপির এই বিজয় ছিল ভাগ্যের এক নাটকীয় পরিবর্তন। দলটির নেতা তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তার মা দুইবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রামের অবিসংবাদিত প্রতীক ছিলেন। ছেলে ফেরার কয়েক দিন পরই খালেদা জিয়া মারা যান। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

ব্যক্তিগত বা পারিবারিক রেষারেষির ঊর্ধ্বে বাস্তব সত্য হলো এই যে, বাংলাদেশ আবারও সেই দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের একটির হাতে পরিচালিত হচ্ছে, যাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতিকে একটি রূপ দিয়েছে। বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল, এরপর হাসিনার কাছে পরাজিত হয়। এখন তারা সেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই ক্ষমতায় ফিরেছে, যা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এই নির্বাচনের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।
অনেক আন্দোলনকারী ঠিক এটাই চেয়েছিলেন- হাসিনার বিদায় এবং অবাধ নির্বাচনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু অনেকের প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। তারা আশা করেছিলেন এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং দেশ পরিচালনায় নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসবে। বাস্তবে তা ঘটেনি।
জেন-জি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি নির্বাচনে তরুণ নেতৃত্বাধীন এনসিপি খুব সামান্যই প্রভাব ফেলতে পেরেছে। তাদের এই শোচনীয় ফলাফল মূলত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কৌশলগত ভুলেরই প্রতিফলন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত এই দলটির হাতে একটি সংগঠন দাঁড় করানোর জন্য এক বছরেরও কম সময় ছিল; সঙ্গে ছিল সীমিত তহবিল এবং শহরকেন্দ্রিক গণ্ডির বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্কের অভাব।
তবে ডিসেম্বর মাসে তারা এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয় যা তাদের ব্যাপক জনসমর্থনের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সক্ষমতা পাওয়ার বিনিময়ে তারা ১১-দলীয় জোটের অংশ হিসেবে মাত্র ৩০টি আসনে লড়তে রাজি হয়। অনেক তরুণ ভোটার, যারা প্রকৃত অর্থে একটি নতুন রাজনীতির আশা করেছিলেন, তারা এই জোটকে পুরোনো ব্যবস্থার কাছে নতিস্বীকার হিসেবে গণ্য করেন। এই সিদ্ধান্ত দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকেও স্পষ্ট করে দেয়: এনসিপির বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান।
২৭ বছর বয়সী এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম একটি আসনে জয়ী হয়েছেন এবং সংসদের অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্যে পরিণত হয়েছেন। দলটি জানিয়েছে যে, তারা এক বছর পর হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী শিবিরে থেকে নিজেদের পুনর্গঠিত করবে। তবে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সীমিত। যে প্রজন্ম এই বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তারা যদি নিজেদের প্রান্তিক অবস্থানে আবিষ্কার করবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে দেয়, তবে তারা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হতে পারে।
একটি অনিশ্চিত পথ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, এই নির্বাচন ছিল একটি প্রকৃত সাফল্য। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৬০ শতাংশ, কারচুপি-ভরা ২০২৪ সালের নির্বাচনে ছিল মাত্র ৪২ শতাংশ। গণভোটে ৬০ শতাংশেরও বেশি ভোটার জুলাই সনদের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন, যা এই সংস্কার কর্মসূচিকে এমন এক গণতান্ত্রিক বৈধতা দিয়েছে যা নতুন সরকারের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।
তবে সব দলকে অবাধে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি হতে পারত। এছাড়া এটি পুরোপুরি সহিংসতামুক্তও ছিল না। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিএনপির সদস্য।
আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার এমন এক রাষ্ট্রযন্ত্রের উত্তরাধিকার হয়েছে, যা কয়েক দশকের একদলীয় আধিপত্যের কারণে চরমভাবে রাজনীতিকীকরণ হয়েছে। পুরনো স্বৈরাচারী অভ্যাস সহজে দূর হয় না। অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিএনপিকে সুশীল সমাজ ও বিরোধী দলগুলোর সাথে প্রকৃত আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো দমন-পীড়ন থেকে বিরত থাকতে হবে।
বর্তমান সরকারের প্রতি প্রস্তাব
সিভিকাস লেন্সের বিশ্লেষণটি ইংরেজি থেকে অনূদিত। সিভিকাস লেন্স দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ-ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। সিভিকাস লেন্স নাগরিক সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে সমসাময়িক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ তুলে ধরে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো-জনগণের আন্দোলনগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া ও নতুন পথ দেখাচ্ছে এবং বিজয় আনছে, তা তুলে ধরা।