র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া বালেন শাহর রাজনৈতিক দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) নেপালের সাধারণ নির্বাচনে এক বিশাল বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সহিংস ‘জেন জি’ আন্দোলনের পর এটিই ছিল নেপালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এতে বালেন শাহ’র দল দেশটির প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর আধিপত্য চুরমার করে দিয়েছে।
নেপালের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের পরিস্থিতির ঠিক উল্টো। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করা হলেও, দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ববর্তী আমলের প্রধান বিরোধী দলই ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (জাতীয় নাগরিক পার্টি) নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
লক্ষ্য এক, ফলাফল ভিন্ন
ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে বিচ্ছিন্ন দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একই, সেটি হলো বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু ফলাফলের ক্ষেত্রে দেখা গেল চরম ভিন্নতা। নেপালে নতুন শক্তি হিসেবে বালেন শাহ সফল হলেও, বাংলাদেশে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন শক্তি সেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।
দুই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: নেপাল বনাম বাংলাদেশ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে, যাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো। অন্যদিকে, নেপালের আন্দোলন ছিল অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল গোটা শাসনব্যবস্থাকেই উপড়ে ফেলা। এই পরিস্থিতির কারণেই ৩৫ বছর বয়সী বালেন শাহ’র মতো নেতারা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে একটি প্রকৃত বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছেন।
বিপরীতে, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো একক নেতা তৈরি করতে পারেনি। এই আন্দোলন মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল, কিন্তু জনগণের সামনে নতুন কোনো বিকল্প নেতৃত্ব তুলে ধরতে পারেনি।
তারেক রহমান ফ্যাক্টর
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান। ফাইল ছবিহাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান একমাত্র নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে সামনে আসেন, যদিও তিনি বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অংশ। টানা ১৭ বছর প্রবাসে বা রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকলেও, তারেক রহমান নতুন চিন্তাধারা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের একটি পরিষ্কার রূপরেখা তুলে ধরেন।
তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্য প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে) শীর্ষক বক্তৃতাটি তার দল বিএনপি-র জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়, যেখানে তারা নাগরিকদের জন্য কী করতে চায় সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেয়।
এই কৌশলটি বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয় এবং তাকে ছাত্র সংগঠনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী পছন্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
উল্লেখ্য যে, ওই ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রান্তিক শক্তি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হয়েছিল। এছাড়া, তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং সংখ্যালঘূদের প্রতি তার ইতিবাচক প্রচারণাও তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করে।
বালেন শাহ’র জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা
গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার জেরে শুরু হওয়া ‘জেন জি’ বিক্ষোভের পর থেকেই বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য দৌড়ে সবার আগে চলে আসেন। যদিও পরবর্তীতে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
নেপালে বালেন মূলত একজন র্যাপার হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। ছবি: সংগৃহীতনেপালে বালেন মূলত একজন র্যাপার হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। তার গানগুলো দেশের সামাজিক অসংগতি এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির কড়া সমালোচনা করায় তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এরপর তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন। আন্দোলনের সময় তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করবেন কি না, তখন তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই ছাত্রনেতারা বেশ কিছু বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং তাদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে পদ গ্রহণ করেন। সাধারণ মানুষের অনেকের কাছেই এটি পরিবর্তনের চেয়ে বরং ক্ষমতার মোহ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
তাছাড়া, সংখ্যালঘু বিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোটবদ্ধ হওয়া অনেককেই তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বিপরীতে, বালেন শাহ এমন একটি প্রচারণা চালিয়েছিলেন যা সংখ্যালঘু—বিশেষ করে মাধেসিদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল, যা তাকে একজন উদার ও সর্বজনীন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশল
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে বালেন শাহর সফল মেয়াদ তাঁর জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলো যেমন—ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, সরকারি জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং দীর্ঘদিনের আবর্জনা নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে মনোনিবেশ করেছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ৩৫ বছর বয়সী এই নেতার জনসভায় উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত এবং তিনি তরুণ ভোটারদের অঘোষিত নেতায় পরিণত হন। এমনকি তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনেও সহায়তা করেন, যারা নির্বাচন তদারকির দায়িত্বে ছিল।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ছাত্রনেতারা একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতের সাথে হাত মিলিয়ে ‘নতুন ব্যবস্থা’ গড়ার ইমেজটি ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তারা নিজেদের নেতাদের জয় নিশ্চিত করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিতেও দ্বিধাবোধ করবেন না।