গত ২৫ জুলাই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছিলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। এই নির্বাচনের জন্য আলাদা করে কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কিন্তু ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে বলেছে, আগামী ২০ আগস্ট নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। তফসিল অনুযায়ী, একাধিক প্রার্থী থাকলে সেদিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে।
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন মো.সাহাবুদ্দিন। নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ইসিকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়। ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে বলেন, এই নির্বাচনে নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের তারিখ ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৮ আগস্ট। আর ভোটগ্রহণ ২০ আগস্ট।
সাধারণত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরকারি দলের দেওয়া একক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। এ ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। একক প্রার্থী থাকলে ১৮ আগস্ট নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে যাবেন।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ১৫ দিন আগে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করে থাকেন। সেক্ষেত্রে ২০ আগস্টের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের সুযোগ নেই এবং অধিবেশন ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে।
একানব্বইয়ে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর একবারই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হয়েছে, ১৯৯১ সালে। এরপর কোনো নির্বাচনে একাধিক প্রাথী না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যেতেন। এবারও সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধী দল থেকে প্রার্থিতা ঘোষণার সম্ভাবনা কম।
স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন কেউ নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার সেই দায়িত্ব পালন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইন অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম আসছে। এর মধ্যে বিএনপির মহাসচিব সচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খোন্দকার মোশারফফ হোসেন, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান আছেন। দলের বাইরে আইরিন খান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নামও শোনা গেছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নামও বলেছেন কেউ কেউ।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ফাইল ছবি
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবেন, সেটা স্থায়ী কমিটি বৈঠক করে ঠিক করবে। পরবর্তীকালে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হলেও সিদ্ধান্তের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
রাষ্ট্রপতি পদে দলের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম বেশি আলোচিত হলেও কেউ কেউ মনে করেন, এতে দল ও সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। যদিও জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব আছে। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন কলাম লেখক মির্জা ফখরুলের প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন, “যে মানুষটি এতদিন রাজপথে কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কারাগারে যাওয়া নেতার পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন—তাকে যদি নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে বন্দি করে দেওয়া হয়, তবে তা আসলে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দিকটাকেই অকার্যকর করে দেওয়ার শামিল। ...অতএব, বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অর্থনৈতিক কূটনীতি, সক্রিয় নেতৃত্ব ও জাতীয় সমঝোতার ভূমিকায় রাখাই হয়তো তার প্রতি প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।”
বিএনপির নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজনের কাছে বিকল্প নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত নন, আবার দলের বাইরেরও নন, এ রকম একজনকে রাষ্ট্রপতি করাটাই যৌক্তিক হবে। এ রকম ব্যক্তি কে আছেন জানতে চাইলে তিনি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমদের কথা বললেন। স্পিকার হওয়ার পর তার কোনো দলীয় দায়িত্ব নেই।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ফাইল ছবি
৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানটি তিনি যেভাবে সামাল দিয়েছেন, তা অন্য কেউ পারতেন কি না বলা কঠিন। সেই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় নির্মিত তথ্যচিত্র নিয়ে এনসিপির নেতা-কর্মীরা আপত্তি জানান। এ নিয়ে হট্টগোল দেখা দিলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সংশোধনের আশ্বাস দেন। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের আহ্বানে এনসপি নেতা আখতার হোসেনকে মঞ্চে এসে বক্তৃতা দেন। তিনি তথ্যচিত্র নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রশংসা করেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “যে তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাইদের ছবি নেই, বেগম খালেদা জিয়ার ছবি নেই সেটি তথ্যচিত্রই হতে পারে না।”
স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ সংসদের দুটি অধিবেশন দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিরোধী দলও তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ আনেনি। তদুপরি তিনি একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এ রকম একজন ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিলে সেটা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে ওই রাজনীতিক মনে করেন। অতীতে একাধিক স্পিকার রাষ্ট্রপতি পদ অলঙ্কৃত করেছেন। তবে দলের একাংশ আবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই রাষ্ট্রপতি পদে উত্তম প্রার্থী মনে করেন।
সেক্ষেত্রে এই দুজনের মধ্যে যে কোনো একজনের দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা