যেদিন প্রথম পর্দায় ভেসে ওঠে মানুষের মুখ!

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যেদিন প্রথম পর্দায় ভেসে ওঠে মানুষের মুখ!
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

যখনকার কথা বলছি তখন লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডের সন্ধ্যাগুলোর বিনোদন ছিল থিয়েটার বা মঞ্চনাটক। সন্ধ্যা হলেই সবাই সেজেগুজে বের হয়ে যেত থিয়েটার দেখতে বা অর্কেস্ট্রো শুনতে। কিন্তু আজ থেকে ঠিক ঠিক ১০০ বছর আগে এক মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সবাই যখন সান্ধ্যকালীন বিনোদনে ব্যস্ত, তখন খ্যাতনামা বিজ্ঞান সংস্থা রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের প্রায় ৪০ জন সদস্য এসব জাঁকজমক বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন সোহোর ২২ নম্বর ফ্রিথ স্ট্রিটের এক অস্থায়ী ল্যাবরেটরি।

সান্ধ্য পোশাকে সজ্জিত এই আমন্ত্রিত অতিথিরা এসেছিলেন তৎকালীন স্বল্প পরিচিত স্কটিশ উদ্ভাবক জন লগি বেয়ার্ডের আমন্ত্রণে। সেই রাতটি টেলিভিশন ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বেয়ার্ড সেদিন সফলভাবে একটি পরীক্ষামূলক প্রোটোটাইপ প্রদর্শন করেছিলেন। এতে রেডিও সম্প্রচারের সাথে সরাসরি চলন্ত ছবি যুক্ত ছিল। এটি ছিল মানুষের মুখমণ্ডল দেখাতে সক্ষম বিশ্বের প্রথম মেকানিক্যাল টেলিভিশন সিস্টেমের প্রদর্শনী। বেয়ার্ড সেই প্রদর্শনী যন্ত্রটির নাম দিয়েছিলেন ‘টেলিভাইজার’। 

যোগাযোগ ও বিনোদন জগতের ইতিহাস বদলে দেওয়া সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল ১৯২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি অর্থাৎ আজকের দিন। 

বেয়ার্ডের এই যন্ত্রটিতে মূলত যান্ত্রিক ঘূর্ণায়মান ডিস্ক ব্যবহার করা হতো, যা চলন্ত ছবিকে স্ক্যান করে ইলেকট্রনিক পালসে রূপান্তর করত। এরপর সেই তথ্য তারের মাধ্যমে একটি স্ক্রিনে পাঠানো হতো, যেখানে স্বল্প রেজল্যুশনের আলো-আঁধারির নকশার মতো ছবি ফুটে উঠত। বেয়ার্ডের প্রথম সেই টেলিভিশন প্রোগ্রামে দুটি ভেন্ট্রিলোকুইস্ট ডামির মাথা দেখানো হয়েছিল।

এই উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বেয়ার্ড জার্মান বিজ্ঞানী পল নিপকোর ১৮৮৪ সালের গবেষণাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। নিপকো ছিদ্রযুক্ত ডিস্ক ব্যবহারের ধারণা দিলেও তিনি কেবল অস্পষ্ট কিছু ছায়াচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বেয়ার্ডই প্রথম ব্যক্তি যিনি স্পষ্ট এবং শনাক্তযোগ্য ছবি তৈরিতে সফল হন। ১৯২৮ সালে তিনি লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কে প্রথম দেশের বাইরে সম্প্রচার করেন এবং একই বছর প্রথম রঙিন টেলিভিশনও প্রদর্শন করেন।

১৯৩২ সালে, যখন রেডিও কর্পোরেশন অফ আমেরিকা (RCA) সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক টেলিভিশন প্রদর্শন করে তখন থেকেই টেলিভিশন প্রযুক্তির বিবর্তন নতুন গতি পায়।

১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি) লন্ডনে নিয়মিত হাই-ডেফিনিশন সম্প্রচার শুরু করে। সে সময় বেয়ার্ডের সিস্টেমের সাথে মারকোনি ইলেকট্রিক অ্যান্ড মিউজিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। মারকোনির ৪০৫-লাইনের ছবি বেয়ার্ডের ২৪০-লাইনের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত হওয়ায় ১৯৩৭ সালের শুরুতে বিবিসি এককভাবে মারকোনি সিস্টেম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত এবং ১৯৫৪ সালে স্থায়ীভাবে রঙিন টেলিভিশনের সম্প্রচার শুরু হয়।

সম্পর্কিত