Advertisement Banner

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র ডলি কেন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন?

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র ডলি কেন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন?
ডলি আনোয়ার অভিনীত দুটি সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ সিনেমার কথা মনে আছে? হ্যাঁ, হ্যাঁ কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৯ সালে তৈরি শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত সিনেমা। সিনেমাটির ভাগ্যে জুটেছিল সাতটি জাতীয় এবং কমপক্ষে পাঁচটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ডলি আনোয়ার। এটি তার অভিনীত প্রথম সিনেমা হলেও–তিনি এর জন্য সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘দহন’–মুক্তি পায় ১৯৮৬ সালে। ১৯৯১ সালের ৩ জুলাই তিনি আত্মহত্যা করেন। কেন?

প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনকে বিয়ে করার আগে ডলি আনোয়ারের নাম ছিল ডলি ইব্রাহিম। তার জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই। তার বাবা মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসক ও জাতীয় অধ্যাপক। ১৯৮০ সালে তিনিই শাহবাগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আজকের বারডেম হাসপাতাল। স্বাস্থ্য খাতে অপরিসীম অবদান রাখায় তাকে ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতা পদকে সম্মানিত করা হয়। ডলির মা ড. নীলিমা ইব্রাহিমকেও সবাই চেনে, বিখ্যাত সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ তার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মগুলোর একটি। বাংলা একাডেমির চেয়ারপারসন ছিলেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও রোকেয়া পদক ছাড়াও ২০০০ সালে পান একুশে পদক।

এমন মহীরুহের ছায়ায় লালিত ডলিও মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মঞ্চ নাটকে তার অভিনয়ের শুরু। ১৬ বছর বয়সে অভিনয় করেন মুনীর চৌধুরীর ‘একতলা দোতলা’ নাটকে। আশির দশকের গোড়ার দিকে জায়গা করে নেন ‘রোজ রোজ’ শিরোনামের একটি ধারাবাহিক নাটকে। দুটি নাটকই বিটিভিতে সম্প্রচারিত হয়েছিল। তারপর শেখ নিয়ামত আলীর সেই কালজয়ী সিনেমায় জয়গুন চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়। প্রথম অভিনীত সিনেমাতেই বাজিমাত। তার অভিনীত শেষ সিনেমা তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ১৯৮৯ সালের ‘হুলিয়া’।

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন আনোয়ার হোসেন। সিনেমাটিতে একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে ডলি ও আনোয়ারের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপর বিয়ে (১৯৭৯)। ডলির প্রথম বিয়ে হয়েছিল রাজু নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ডলি রাজুকে ছেড়ে তাকে যখন বিয়ে করেন, তখন ডলির একটি ৭ বছরের ছেলে ছিল। বিয়ের পরের ১১ বছর ডলি নাকি তার সেই ছেলেকে দেখার সুযোগ পাননি। প্রতি সন্ধ্যায় ছেলের জন্য কাঁদতেন। আনোয়ার হোসেনের দাবি, ১৯৯১ সালের ৩ জুলাই ডলি আত্মহত্যা করলেও তার আগে পাঁচবার তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরায় ডলি আনোয়ার
আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরায় ডলি আনোয়ার

কিন্তু ‘ডলি ও মিতা–দু’টি খসে পড়া তারা’ শিরোনামের একটি লেখায় নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ বেগম মমতাজ হোসেন জানিয়েছেন, স্বামী আনোয়ার হোসেন তালাকনামা পাঠালে ডলি তা মেনে নিতে না পেরে বিষপান করেন বলে গুজব আছে। তবে বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক খ ম হারূন তার বইয়ে সরাসরি লিখেছেন, তিনি জানতে পারেন, “আত্মহত্যার আগে আনোয়ার হোসেন কয়েক দিন ধরে রাতে বাসায় ফিরতেন না। এক ফরাসি নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক, যা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না ডলি।…তিনি আত্মহত্যা করেন ‘আনোয়ার ভাইয়ের ওপর একরাশ অভিমান নিয়ে।” খ ম হারূন আরো জানিয়েছেন, “আনোয়ার ভাই এরপর আর ঢাকায় থাকেননি। ফরাসি প্রেমিকার সঙ্গে প্যারিস চলে যান। সেখানেই বিয়ে করেন। এক সময় সে বিয়েও টেকে না।”

আজ পর্যন্ত পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি ডলির আত্মহননের কারণ। একইভাবে জানা যায়নি, কীভাবে মারা গেলেন আনোয়ার হোসেন। ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর রাজধানীর পান্থপথে একটি হোটেল থেকে এই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী সিনেমাটোগ্রাফার ও আলোকচিত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ দিয়ে শুরু করেছিলাম, তা দিয়েই শেষ করি। জয়গুন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডলি কিন্তু প্রথম পছন্দ ছিলেন না। প্রথমে ফেরদৌসী মজুমদারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। তারপর তাকেই জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এই চরিত্রে কাকে নেওয়া যায়, ফেরদৌসী মজুমদারই ডলিকে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র

কাউন্টার ফটো, ডিসেম্বর ২০১৪ সংখ্যা

শঙ্কিত পদযাত্রা, খ ম হারূন

দ্য ডেইলি স্টার, ৭ আগস্ট ২০০৯

বাংলা ট্রিবিউন, ১ ডিসেম্বর ২০২৬

অদ্বিতীয়া ডলি, রশীদ হায়দার

দৈনিক জনকণ্ঠ, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩

সম্পর্কিত