ads

ইএমআই ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়াচ্ছে?

ইএমআই ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়াচ্ছে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার এপ্রিল মাসের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। আর, এক বছরের ব্যবধানে এর ব্যবহার বেড়েছে ৩৩ শতাংশের বেশি।

অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে।

Advertisement

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, গত মে মাসে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এপ্রিল মাসে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বছরভিত্তিক হিসাবেও ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে ধার করে চলার প্রবণতা থেকে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে।

অনেকে আবার ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধিকে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়া হিসাবে দেখছেন। যা সার্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি ও স্থানীয় মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে ক্রেডিট কার্ডের ‘০% ইএমআই’ বা সুদমুক্ত কিস্তি সুবিধা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘স্বস্তির কারণ’ হয়েছে। 

অর্থনীতির ভাষায় একে অর্থনৈতিক লাইফলাইন বা ফিন্যান্সিয়াল বাফার বলা হয়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রিটেল ব্যাংকিং ও কনজ্যুমার ফাইন্যান্স ইকোসিস্টেমে এটি অন্যতম সফল ও বৈপ্লবিক বিজনেস মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও মনে করেন ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, ইএমআই সুবিধা ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ার একটি অন্যতম কারণ।

দামি লাইফস্টাইল গ্যাজেট, নিত্যপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, শিক্ষা খরচ, জরুরি চিকিৎসা ব্যয় কিংবা বিমান টিকিট ক্রয়ের মতো বড় অঙ্কের খরচগুলোকে ক্রেডিট কার্ড হোল্ডারদের সুদের বোঝা ছাড়াই মাসিক ছোট ছোট কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ করে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের এই ব্যাংকিং মডেল এদেশের মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক আচরণে পরিবর্তন এনেছে।

একদিকে এটি ভোক্তাকে তাৎক্ষণিক বড় মূলধনী খরচের ধাক্কা থেকে রক্ষা করছে। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ বাজার এবং করপোরেট চেইন শপগুলোর বিক্রির প্রবৃদ্ধিকেও সচল রাখছে।

মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক আচরণের রূপান্তর

প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক আচরণ ছিল ঝুঁকি-বিমুখ।

অর্থাৎ, কোনো দামি জিনিস কেনার আগে দীর্ঘদিন ধরে আয়ের একটি অংশ সঞ্চয়ের পর সেই টাকাতেই তা কেনা হতো।

কিন্তু ক্রেডিট কার্ডের ০% ইএমআই এই মনস্তত্ত্বকে পরিবর্তন করে ‘ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট’ বা সুশৃঙ্খল নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করেছে।

সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, এই অফারটির নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার মধ্যবিত্তকে ঋণের জালে না জড়িয়ে বরং আয়-ব্যয়ের একটি ভারসাম্য আনার সুযোগ দেয়।

ব্যাংকগুলো যখন নামী মার্চেন্টদের (যেমন: সনি, সিঙ্গার, বাটারফ্লাই, অ্যাপল গ্যাজেট স্টোর বা বড় চেইন হাসপাতাল) সাথে চুক্তি করে কোনো অতিরিক্ত সুদ ছাড়াই ৩, ৬, ৯ বা ১২ মাসের কিস্তি সুবিধা দেয়; তখন একজন গ্রাহক তার মাসিক নির্দিষ্ট আয়ের মধ্য থেকেই বড় খরচটি অনায়াসে সামাল দিতে পারেন।

ইএমআই যেভাবে মধ্যবিত্তের বাজেট ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখছে

০% ইএমআই-এর ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবটি তাত্ত্বিকের চেয়ে গাণিতিকভাবে বেশি স্পষ্ট। বিষয়টি এমন-দবির উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যম সারির কর্মকর্তা।

ধরা যাক, তার মাসিক নিট বেতন ৭০ হাজার টাকা। সন্তানের অনলাইন ক্লাস এবং নিজের জরুরি কাজের জন্য একটি ল্যাপটপ কেনা জরুরি।

দাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এখন তার হাতে কী কী বিকল্প আছে?

প্রথাগত ক্যাশ পেমেন্ট বা সঞ্চয় মডেল অনুযায়ী, দবির উদ্দিন যদি ল্যাপটপটি এককালীন নগদে কিনতে চান, তবে তাকে তার এক মাসের বেতনের চেয়েও বেশি টাকা একবারে খরচ করতে হবে।

যা তার পক্ষে অসম্ভব। তিনি যদি প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে জমান, তবে ল্যাপটপটি কিনতে তার ১২ মাস সময় লাগবে। 

কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে এক বছর পর ল্যাপটপটির দাম বেড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা হয়ে যেতেও পারে। এমনটি হলে তার সঞ্চয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো হবেই না বরং এক বছর পরও তিনি ও তার সন্তান প্রযুক্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবেন।

ক্রেডিট কার্ডের ০% ইএমআই (১২ মাসের কিস্তি) ব্যবহার করে দবির উদ্দিন ল্যাপটপটি আজই ঘরে আনতে পারবেন।

এতে করে দবির উদ্দিন কী কী সুবিধা পাবেন? তার বেতনের ওপর চাপ পড়ল না। পরে ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি থেকে আর্থিক সুরক্ষা পেলেন।

সময় মতো কিস্তি পরিশোধ করলে কোনো সুদ ছাড়াই নির্ধারিত দামেই বাকিতে পণ্যের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা হলো।

০% ইএমআই দবির উদ্দিনের পকেটের তারল্য ধরে রেখেছে। তিনি ল্যাপটপটি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করে তার উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছেন, আবার বাকি ৬০ হাজার টাকা দিয়ে তার মাসিক অন্যান্য পারিবারিক খরচ ও সঞ্চয় ঠিক রাখছেন।

ব্যাংকিং পরিভাষায় ভোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অর্থীনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এই ইএমআই প্রোগ্রামকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও টেকসই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট তাদের নীতিমালায়ও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

আগে ব্যাংকগুলো ০% ইএমআই বললেও ভেতরে ছোট অক্ষরে ১-২% ‘হ্যান্ডলিং ফি’ বা ‘প্রসেসিং ফি’ রাখত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনার পর, ব্যাংকগুলোকে তাদের ‘কি ফ্যাক্ট স্টেটমেন্ট’ (কেএফএস) এবং মার্চেন্ট পেমেন্ট ডিসক্লোজারে এই ফি-এর কথা স্পষ্ট উল্লেখ করতে হয়, যা গ্রাহককে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চার্জ থেকে সুরক্ষা দেয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী, ইএমআই-এর মাধ্যমে পণ্য কেনার সাথে সাথে পণ্যের মোট মূল্য গ্রাহকের ক্রেডিট লিমিট থেকে ‘ব্লক’ হয়ে যায়।

প্রতি মাসে কিস্তি পরিশোধের সাথে সাথে ওই সমপরিমাণ লিমিট আবার উন্মুক্ত হয়। এটি গ্রাহককে ওভার-স্পেন্ডিং বা আয়ের অতিরিক্ত কার্ড ব্যবহার করা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিরত রাখে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, “রিটেল লোনের চেয়ে ক্রেডিট কার্ডের ইএমআই সুবিধা মধ্যবিত্তের জন্য অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এটি উৎপাদনশীল খাতের পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধরে রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় নজর রাখে যাতে কোনো ব্যাংক ০% নাম দিয়ে গ্রাহকের ওপর কোনো গোপন সুদ আরোপ করতে না পারে। নীতিমালার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় এই ইএমআই ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

ক্রেডিট কার্ডের এই সফল ব্যবসায়িক মডেলের পেছনে রয়েছে ব্যাংক ও মার্চেন্টদের মধ্যে একটি ‘উইন-উইন’ চুক্তি।

ব্যাংক যখন কোনো বড় ব্র্যান্ডকে বিপুল পরিমাণ গ্রাহক এনে দেয়, তখন মার্চেন্ট বা ব্র্যান্ডটিই সুদের সমপরিমাণ অর্থ (ভর্তুকি হিসেবে) ব্যাংককে ডিসকাউন্ট হিসেবে দেয়।

ফলে গ্রাহককে কোনো সুদ দিতে হয় না।

ক্রেডিট কাড প্রোগ্রাম সম্প্রসারণে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সফল প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান) মো. খোরশেদ আনোয়ার চরচাকে বলেন, “বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গ্রাহকদের জন্য শুধু ক্রেডিট সুবিধা নয়, বরং স্মার্ট ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ০% ইএমআই সুবিধা গ্রাহকদের এককালীন বড় অঙ্কের ব্যয়কে কয়েক মাসে ভাগ করে পরিশোধ করার সুযোগ দেয়, ফলে তাদের মাসিক বাজেটের ওপর চাপ কমে এবং প্রয়োজনীয় কেনাকাটা পিছিয়ে দিতে হয় না।”

এই ব্যাংকার আরও বলেন, “ইবিএলে আমরা দেখেছি যে উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে এই সুবিধার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে, গত ঈদুল আজহার সময়েই ইবিএল কার্ড ব্যবহার করে ইএমআই লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাহকরা এখন কেবল ডিসকাউন্ট নয়, বরং আর্থিক পরিকল্পনার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও ইএমআই সুবিধাকে গ্রহণ করছেন।”

এই ইএমআই ইকোসিস্টেমকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেছে ব্র্যাক ব্যাংক।

বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি বাংলা কিউআর এর প্রকল্পকে স্বাগত জানানোর পাশপাশি ক্রেডিট কার্ডেরও গুরুত্বপূণ ভূমিকা আছে বলে মনে করেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান।

চরচাকে তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে, সেই দিন খুব বেশি দুরে নয়; এমন একটি সময় আসবে যখন বাংলাদেশের মানুষ পকেটে ক্যাশ টাকার বদলে কেবল কার্ড এবং মোবাইল ফোন রাখবে। তাই কিউআর কোড ও কার্ড-উভয় মাধ্যমই সমান্তরালভাবে দেশের ক্যাশলেস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে।”

লাতিন আমেরিকার অন্যতম উদীয়মান অর্থনীতি ব্রাজিল এবং এশিয়ার মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিটেল ব্যাংকিং গাইডলাইনে ০% ইএমআই-এর মতো ফ্লেক্সিবল পেমেন্ট পদ্ধতিকে উৎসাহিত করেছে।

ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন উচ্চ সুদের কনজুমার লোন বাদ দিয়ে সুদমুক্ত ইএমআই বা পারসেলামেনতো (ব্রাজিলিয়ান কিস্তি ব্যবস্থা) ব্যবহার শুরু করে, তখন পরিবারগুলোর দেউলিয়া হওয়ার হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক ও সুশৃঙ্খল কিস্তি সুবিধা গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক ব্যাংকিং নীতিনির্ধারকরা ক্রেডিট কার্ডের ০% ইএমআই মডেলকে বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।

অন্তর্বতীকালীন সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এই মডেলটি প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি গ্রাহকবান্ধব বলে মন্তব্য করেন।

ইকোনমিক থট অ্যান্ড পলিসি ডায়ালগ, ২০২৫ এ তিনি বলেন, “বাজারে যখন মানুষের প্রকৃত আয় সংকুচিত হচ্ছে, তখন ০% ইএমআই সুবিধা মধ্যবিত্তের জন্য একটি রক্ষাকবচ। এটি একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখছে, অন্যদিকে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং ও রিটেল খাতে চাহিদার ধস নামতে দিচ্ছে না। তবে ব্যাংকের উচিত এই কিস্তির শর্তগুলো এবং যেকোনো প্রসেসিং ফি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা, যাতে গ্রাহক বিভ্রান্ত না হন।”

ব্যাংকিং গবেষক বিআইবিএম-এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব মনে করেন, এই মডেলটি গ্রাহকদের আর্থিক শৃঙ্খলা বা ফিন্যান্সিয়াল ডিসিপ্লিন শেখায়।

চরচাকে তিনি বলেন, “০% ইএমআই হলো কনস্ট্রাকটিভ ক্রেডিটের একটি দারুণ উদাহরণ। যখন একজন গ্রাহক জানেন যে তার কার্ডের লিমিট ব্লকড আছে এবং প্রতি মাসে তাকে একটি নির্দিষ্ট কিস্তি দিতে হবে, তখন তিনি তার অন্যান্য অনাবশ্যক খরচ কমিয়ে ফেলেন। এটি মধ্যবিত্তকে বাজেট ও আর্থিক পরিকল্পনার মধ্যে চলতে বাধ্য করে, যা একটি সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ।”

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সিনিয়র আইটি ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা সাবরিন গত বছর তার ক্রেডিট কার্ডের ০% ইএমআই সুবিধা ব্যবহার করে নিজের মায়ের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরের একটি নামী চেইন হাসপাতালে বড় অংকের বিল পরিশোধ করেন।

নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে চরচাকে তিনি বলেন, “হঠাৎ করে মায়ের অপারেশনের জন্য যখন এককালীন দেড় লাখ টাকার প্রয়োজন হয়, তখন নগদ টাকা জোগাড় করা আমার জন্য বেশ কঠিন ছিল। পার্সোনাল লোনের প্রসেসিং হতেও সময় লাগে, আবার সুদও চড়া। আমি হাসপাতালের কাউন্টারে ইবিএল কার্ড দিয়ে ছয় মাসের ০% ইএমআই সুবিধা নিই। প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়াটা আমার মাসিক বেতনের মধ্যে খুব সহজেই অ্যাডজাস্ট হয়ে গেছে। কোনো অতিরিক্ত সুদ বা জরিমানা দিতে হয়নি। এই ইএমআই সুবিধা না থাকলে আমাকে হয়তো আত্মীয়দের কাছে হাত পাততে হতো।”

একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় অংশ নির্ভর করে তার মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা ও সচ্ছলতার ওপর।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রেডিট কার্ডের ‘০% ইএমআই’ মডেলটি কেবল একটি প্রমোশনাল অফার নয়, বরং সমসাময়িক মূল্যস্ফীতির বাজারে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান অক্ষুণ্ন রাখার আধুনিক অর্থনৈতিক হাতিয়ার।

ব্যাংকগুলোর মার্চেন্ট পার্টনারশিপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি এই খাতকে আরও বেশি বিশ্বস্ত ও জনপ্রিয় করে তুলছে।

দীর্ঘমেয়াদে এই সুশৃঙ্খল ক্যাশ ফ্লো ব্যবস্থাপনা দেশের খুচরা ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা রাখার পাশাপাশি একটি টেকসই ও আধুনিক ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সংস্কৃতি গঠনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

তবে, আর্থিক লেনদেনে অসাবধানী আচরণ ভোক্তাকে বিপাকে ফেলতে পারে। আর ভোক্তার সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা তাকে দিতে পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বস্তি।

সম্পর্কিত