ads

বিদায়ী রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি নিয়ে কেন প্রশ্ন তুলছে এনসিপি?

বিদায়ী রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি নিয়ে কেন প্রশ্ন তুলছে এনসিপি?
কার্টুন চরচা

সদ্য রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়া মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠার সাথে সাথেই তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। পরে শুক্রবার সাহবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর এনসিপি সংবাদ সম্মেলন করে একই দাবি তোলে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মো. সাহাবুদ্দিনের ‘ভূমিকার’ জন্য দলটির নেতারা বলছেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতির যে দায়মুক্তির বিধান আছে, তা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন ঘটনায় সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, যা তদন্ত ও বিচারের দাবি রাখে।

Advertisement

একদিকে সংবিধান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালীন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তির বিধান দিয়েছে; অন্যদিকে এনসিপি বলছে, পদত্যাগের পর সেই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয় এবং অভিযোগগুলোর বিচার হওয়া উচিত।

এই দুই অবস্থানের ভিন্নতা থেকেই সাবেক রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি ও বিচারযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। ওই সরকারের করা অধ্যাদেশগুলোতেও স্বাক্ষর করতে হয়েছে তাকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি উঠেছিল। ওই সময় তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল বিভিন্ন সংগঠন। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মো. সাহাবুদ্দিনকে সরাতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিও তাকে সরানোর পথে হাঁটেনি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সংসদে নজিরবিহীন ক্ষোভও প্রকাশ করে। এই জোটে এনসিপিও রয়েছে।

এনসিপির যত অভিযোগ

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন অবিলম্বে মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি বলেন, পদত্যাগপত্রে উপস্থাপিত বক্তব্যকে তার দল ‘অপ্রাসঙ্গিক ন্যারেটিভ’ হিসেবে দেখছে।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা চরচাকে বলেন, তাদের দাবি মূলত দুটি দিককে ঘিরে।

প্রথমত, গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ পর্যায়ে পড়ে বলে দলটি মনে করে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন জহিরুল ইসলাম।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের সময়ের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। মুসার বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা জজ হিসেবে, দুর্নীতি দমন কমিশনে কাজ করার সময় এবং ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন। ফাইল ছবি
মো. সাহাবুদ্দিন। ফাইল ছবি

আখতার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, পদত্যাগপত্রে অসুস্থতার প্রসঙ্গ উল্লেখ থাকলেও সেটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা তাকে একটি ‘সেফ এক্সিট’ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এনসিপির মতে, এমন কোনো সুযোগ দেওয়ার অবকাশ নেই এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিচার হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবর জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কিছু বলার নাই। দেশের রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। এটা একটা সলেম অকেশন, লেট আস ডু ইট ফর হিম।”

সংবিধানের দায়মুক্তির বিধান

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি সংক্রান্ত বিধান উল্লেখ রয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো কাজ করলে বা না করলে সে বিষয়ে তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না।

৫১ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের বা চালু রাখা যাবে না এবং তার গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য আদালত কোনো পরোয়ানা জারি করতে পারবে না।

এ ছাড়া সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া), এবং প্রধানমন্ত্রী কী পরামর্শ দিয়েছেন তা আদালত তদন্ত করতে পারবে না।

সংবিধানের এসব বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি মূলত দায়িত্বে থাকার সময়ের জন্য কার্যকর থাকে। অর্থাৎ, তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া যায় না।

এনসিপির নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতির পদে থাকা অবস্থায় আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব না হলেও পদত্যাগের পর সেই বাধা আর নেই। আখতার হোসেন দাবি করেন, “পদত্যাগ করা মাত্রই তার ব্যাপারে আইনগত দায়মুক্তির কোনো জায়গা নেই।”

এনসিপির দাবি, সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনা সম্ভব। দলটির মতে, গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তার বিচার নিশ্চিত করতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সম্পর্কিত